গত ৯ আগস্ট রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের আকস্মিক পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যসেবা খাতের নাজুক চিত্র উন্মোচিত হয়। হাসপাতালটিতে দীর্ঘ এক মাস ধরে জলাতঙ্ক প্রতিরোধের র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং জীবনরক্ষাকারী নরমাল স্যালাইনের মতো জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত শূন্য থাকায় মন্ত্রী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার এই চরম ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নূর আলম দীনকে উত্তরবঙ্গের কোনো জেলায় শাস্তিমূলক বদলির মৌখিক নির্দেশ প্রদান করেন তিনি। মন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থান স্বাস্থ্য প্রশাসন ও স্থানীয় মহলে তাৎক্ষণিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে, যা মূলত সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনারই একটি প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতালটির এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, বিশেষ করে জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি নিয়ে আসা ব্যক্তিদের জন্য এই ভ্যাকসিন অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকার বিষয়টি রোগীদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতালটি বরাবরই অবহেলার শিকার, যেখানে সাধারণ স্যালাইনের মতো প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীও পাওয়া যায় না। সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে টিকা শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হলেও, এক মাস ধরে কেন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, তা নিয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘস্থায়ী এই সরবরাহ ঘাটতি মূলত জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নজরদারি ও দায়বদ্ধতার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে।
ঘটনার দুই ঘণ্টা পর চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি জেনারেল হাসপাতালে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে মন্ত্রীর আগের অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে যায়। সিভিল সার্জনের দেওয়া ব্যাখ্যাকে ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী তার বদলির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। মন্ত্রীর এই দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন জরুরি ওষুধের সংকট নিরসনে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল, সেখানে দায়ীদের ক্ষমা করে দেওয়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বা ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়াই ঘটনাটির সমাপ্তি ঘটে।
হাইমচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই ঘটনাটি দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থার একটি চূড়ান্ত নিদর্শন। জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া ভবিষ্যতে প্রশাসনিক শৈথিল্যকে আরও প্রশ্রয় দিতে পারে। এ ধরনের ঘটনা কেবল স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার মানকেই নিচে নামায় না, বরং সরকারের স্বাস্থ্য খাতের ওপর জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওষুধ সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় এমন সংকটের পুনরাবৃত্তি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েই থাকবে।