সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং এর পেছনে কারসাজির অভিযোগ, যা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তা আবারও দেশের শেয়ারবাজারে করপোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত এক বছরে এই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মৌলিক আর্থিক সূচকগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়; এর আগে ২০২০ সালে তালিকাভুক্ত ফ্লোটিং হসপিটাল লিমিটেডের শেয়ারের মূল্য কারসাজি এবং পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছিল। এই পুনরাবৃত্ত ঘটনাগুলি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
শেয়ারবাজারে কারসাজির মূলে থাকে করপোরেট গভর্ন্যান্সের নিদারুণ দুর্বলতা। অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা নামমাত্র, যেখানে তারা কোম্পানির মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেন না বা তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বোর্ডের অভ্যন্তরে পারিবারিক প্রভাব বা মালিকানার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণ প্রায়শই স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে, যা কোম্পানির তথ্য পাচার বা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য প্রভাবিত করার সুযোগ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বড় সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসার আগেই কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা (ইনসাইডার) শেয়ার কেনাবেচায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা স্পষ্টতই ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের লঙ্ঘন। এই ধরনের কার্যকলাপ কোম্পানির সুনাম নষ্ট করে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটির দুর্বলতা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাবও এই কারসাজির পথ সুগম করে তোলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করপোরেট গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্কে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় বাধা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারসাজি সনাক্তকরণ, তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের সক্ষমতা এবং নিরপেক্ষতা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তবে, প্রায়শই দেখা যায়, তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতায় ভোগে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বিএসইসি-এর জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। আধুনিক ডেটা অ্যানালাইসিস টুলস এবং ফোরেন্সিক অডিটের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারসাজি সনাক্তকরণের সক্ষমতা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। এডিবি (ADB) তাদের 'বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় বিএসইসি-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ করলেও, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও অধরা। ফলস্বরূপ, বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং বাজারের প্রতি তাদের আস্থা হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর।
| বছর | শেয়ার কারসাজির অভিযোগ (সংখ্যা) | বিএসইসি কর্তৃক আরোপিত জরিমানা (কোটি টাকা) | অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা (সংখ্যা) | শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আস্থা সূচক (১-৫ স্কেলে) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮ | ৩২ | ১.৫ | ৫ | ৩.১ |
| ২০১৯ | ৪০ | ২.২ | ৭ | ২.৯ |
| ২০২০ | ৫২ | ৩.৮ | ১০ | ২.৫ |
| ২০২১ | ৬০ | ৪.৫ | ১২ | ২.৩ |
| ২০২২ | ৬৫ | ৫.১ | ৮ | ২.১ |
উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর বার্ষিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর বাজার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১২' (যা বর্তমানে সংশোধনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে) এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে তারা প্রকৃত অর্থে কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন।
- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফরেনসিক অডিট ও ডেটা অ্যানালাইসিসের জন্য বিশেষায়িত একটি ইউনিট গঠন করতে হবে, যা World Bank এবং ADB-এর কারিগরি সহায়তায় প্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা পরিচালিত হবে।
- শেয়ারবাজার আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং 'সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯' এর অধীনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোকে আরও সক্রিয় ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে, যাতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করা যায়।