মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

আনোয়ার পারভেজ  avatar   
আনোয়ার পারভেজ
মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরি...

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে মিথ্যা ঘোষণা, অতিরিক্ত মূল্য দেখানো (over-invoicing) এবং কম মূল্য দেখানো (under-invoicing) এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত অর্থ পাচারের ঘটনা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেন একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করছে, তেমনি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন দেশের আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে।

অর্থ পাচার ও হুন্ডি প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অন্যতম। তবে, এই আইনগুলির যথাযথ প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হচ্ছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সক্ষমতার অভাব, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি প্রায়শই অর্থ পাচারকারীদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার চক্রের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী চক্রের যোগসাজশ এবং উন্নত দেশগুলিতে অর্থ পাচারের নিরাপদ রুটগুলি চিহ্নিতকরণ ও বন্ধ করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। World Bank এবং ADB-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলিতেও বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কার্যকর নজরদারির অভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট, শেয়ারবাজার এবং স্বর্ণের মতো খাতে অবৈধ অর্থের বিনিয়োগ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যা অর্থ পাচারের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

হুন্ডি প্রতিরোধে আরেকটি বড় ব্যর্থতার কারণ হলো প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়াকে যথেষ্ট সহজ ও লাভজনক করতে না পারা। অনেক প্রবাসী শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বৈধ চ্যানেলের দীর্ঘসূত্রতা এবং তুলনামূলক কম বিনিময় হারের কারণে হুন্ডিকে বেছে নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করছে, তবে হুন্ডি চক্রের দ্রুততা এবং উচ্চ বিনিময় হারের প্রলোভন অনেক সময় এসব প্রণোদনাকে ছাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, ডিজিটাল হুন্ডির উত্থান, বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার, প্রচলিত আইন প্রয়োগকারী পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন সনাক্ত করা এবং এর উৎস ও গন্তব্য নির্ধারণ করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে, যার ফলে হুন্ডি প্রতিরোধে প্রথাগত নজরদারি ব্যবস্থা অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্স এবং বিভিন্ন আন্তঃসংস্থা কমিটিগুলি নিয়মিত সভা করলেও, তাদের সুপারিশগুলির বাস্তবায়ন এবং ফলোআপের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে, যা অর্থ পাচার ও হুন্ডি চক্রকে অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছে।

অর্থবছর অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থের আনুমানিক পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষতি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর অধীনে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা
২০১৮-১৯ ৭.২০ ২.৫০ ৯৩
২০১৯-২০ ৬.৮০ ৩.১০ ১০৮
২০২০-২১ ৭.৫০ ৩.৬৫ ১১৮
২০২১-২২ ৮.০০ ৪.০০ ১২৫
২০২২-২৩ ৮.৫০ ৪.২০ ১৩৫

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, BFIU এবং Global Financial Integrity (GFI) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (AML) এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (CFT) আইন যেমন FATF (Financial Action Task Force) এর ৪0টি সুপারিশ মেনে চলার জন্য বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাস্টমার ডিউ ডিলিজেন্স (CDD) এবং ট্রানজেকশন মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করতে হবে এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (STR) এর সংখ্যা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)-এর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে, বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত অসঙ্গতি, অতিরিক্ত মূল্য দেখানো (over-invoicing) এবং কম মূল্য দেখানো (under-invoicing) এর মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করে রিয়েল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে বিদ্যমান প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুততর করতে হবে। একই সাথে, ডিজিটাল হুন্ডি রোধে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েগুলির ওপর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে এবং অবৈধ লেনদেনকারীদের বিরুদ্ধে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ এর অধীনে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনোয়ার পারভেজ

আনোয়ার পারভেজ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator