মহাসড়কে স্লিপার বাসের মরণফাঁদ: বিলাসবহুল সেবার আড়ালে অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুঝুঁকি.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মহাসড়কে স্লিপার বাসের মরণফাঁদ: বিলাসবহুল সেবার আড়ালে অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুঝুঁকি..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
মহাসড়কে স্লিপার বাসের মরণফাঁদ: বিলাসবহুল সেবার আড়ালে অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুঝুঁকি..
মহাসড়কে স্লিপার বাসের মরণফাঁদ: বিলাসবহুল সেবার আড়ালে অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুঝুঁকি..
ছবি: সংগৃহীত

দেশের মহাসড়কে অনুমোদনহীন কাঠামোর স্লিপার বাসের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা নিয়মিত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।..

দেশের মহাসড়কগুলোতে বর্তমানে বিলাসবহুল স্লিপার বাসের আড়ালে চরম অনিরাপত্তা ও মৃত্যুঝুঁকি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। গত ৭ আগস্ট সিলেটের ওসমানীনগরে এবং ৯ জানুয়ারি মিরসরাইসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় এই বাহনগুলোর ফিটনেস ও নকশা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মূলত সাধারণ বাসকে অবৈধভাবে কাঠামোগত পরিবর্তন করে স্লিপার বাসে রূপান্তর করায় এগুলোর যান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে উচ্চগতিতে চলার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো বা মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটছে। বিআরটিএ-এর প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, অধিকাংশ স্লিপার বাসই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে, যা যাত্রী নিরাপত্তার মৌলিক শর্তগুলোকেই সরাসরি উপেক্ষা করে মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

ভুক্তভোগী যাত্রী এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্লিপার বাসের ভেতরের সংকীর্ণ পরিবেশ এবং অপর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা যেকোনো দুর্ঘটনার মুহূর্তে যাত্রীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চলন্ত বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জরুরি পরিস্থিতিতে এসব বাসের ভেতর থেকে বের হওয়ার পথ কতটা সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা দুর্ঘটনার সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পান না, কারণ বাসগুলোর অভ্যন্তরীণ সিট বিন্যাস ও শক্ত কাঠামো তাদের আটকে ফেলে। এছাড়া, অতিরিক্ত কাঠামো সংযোজনের ফলে বাসের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি বা ভারকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় চালকের পক্ষে অতি দ্রুত গতিতে বাস নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা প্রতিনিয়ত সাধারণ যাত্রীদের জীবনের বিনিময়ে ব্যবসায়িক মুনাফার দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিআরটিএ-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তারা দায়সারা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যদিও সাম্প্রতিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে কক্সবাজারে একাধিক বাসের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করার ঘটনা এই অনিয়মের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। বাস মালিক সমিতির একাংশ বাসের আধুনিকায়নের দোহাই দিলেও, কাঠামোগত পরিবর্তনের পর বাধ্যতামূলক প্রকৌশলগত পরীক্ষার অভাব ও ফিটনেস সনদ প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল চালকের অদক্ষতাকে দায়ী করলেই হবে না, বরং যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনগুলো প্রশাসনের নাকের ডগায় ফিটনেস সনদ নিয়ে রাস্তায় নামছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির অভাব এবং অবৈধ রূপান্তর রোধে কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই মূলত এই বাহনগুলো মহাসড়কে চলমান কফিনে পরিণত হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অকাল মৃত্যু রোধে স্লিপার বাসের নকশা ও কাঠামো পরীক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র কারিগরি কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই এই অবৈধ কাঠামো পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে যারা জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে, তাদের দৌরাত্ম্য থামাতে কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষে বিলাসবহুল বাসের নামে এই মরণফাঁদগুলো বন্ধ করতে না পারলে, কেবল তদন্ত কমিটি বা ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, যা পুরো পরিবহন খাতের ওপর জনআস্থাকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator