বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নজিরবিহীন সংকট নিরসনে বিরোধী দলকে ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যার বিপরীতে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পাল্টা জবাব দিয়েছেন। বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আগেই প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এবং সেমিনারে আলোচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশাল মন্ত্রিসভা ও ৬২ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ থাকা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তাঁর কাছে পৌঁছায়নি বা সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি, যা সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের চরম গাফিলতি ও অকার্যকারিতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছে বিরোধী পক্ষ। তারা মনে করছেন, গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ দেওয়া নয়, বরং সরকারের নিজের কাজের জবাবদিহি করাই প্রথাগত নিয়ম হওয়া উচিত ছিল।
ভুক্তভোগী নাগরিক সমাজ ও শিল্পমালিকদের অভিযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের ভারী শিল্পখাত স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সরকারের বর্তমান প্রশাসন দলীয় পদায়নের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান বা ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বিশেষ করে মহেশখালী এফএসআরইউ-তে অগ্নিকাণ্ডের পর রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি বা নাশকতা সংক্রান্ত স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সচিবালয়ের নতুন ও অনভিজ্ঞ আমলাদের লবি গ্রুপের পরামর্শে চলার প্রবণতাকে সংকট গভীরতর হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি নথিপত্রে সমাধান থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন না করায় সাধারণ মানুষ চরম লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বিদ্যুৎ খাতের স্থবিরতা কাটাতে বিরোধী দল সরকারের সামনে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সরাসরি বড় শিল্প গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে, যা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই এবং এটি কেবল প্রশাসনিক এসএলএ ফরম্যাট ও হুইলিং চার্জ নির্ধারণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব। বিরোধী দলের দাবি, সরকার যদি এই পলিসি বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তবে তা সক্ষমতার ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হবে। তারা অবিলম্বে বিদ্যুৎ সংকটের মতো জাতীয় ইস্যুতে আলোচনার জন্য বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিরোধী দলের পেশ করা ১৫ দফা প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেন, যা বর্তমানের অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র কার্যকর পথ হতে পারে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত ছয় মাসের সময়সীমাকে একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিরোধী দল। তারা স্পষ্ট করেছেন যে, সমাধানের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই সরকারের টেবিলে বিদ্যমান, এখন কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই দেশের এই অন্ধকার পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আগামী ছয় মাসের মধ্যে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়ন না হলে তা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশবাসী এই ছয় মাস শেষে জানতে চাইবে, সমস্যার অভাব ছিল নাকি সমাধানের সদিচ্ছার অভাব—যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত সরকারকেই বহন করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ফল যে ভয়াবহ হতে পারে, তা বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।