জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সম্প্রতি বিএনপির নেতাকর্মীদের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন যে, বিএনপি যেভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দলটি নিজেই নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সারজিসের ভাষ্যমতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বিএনপিই বিএনপির জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। তিনি দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জমি দখল, দোকানপাটে চাঁদাবাজি এবং সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার চরম অবনতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। মূলত, রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সারজিস আলম তার প্রেক্ষিতেই এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
সারজিস আলমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বেপরোয়া ভাব কাজ করছে। তিনি তার পোস্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিএনপি এখন কেবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজেদের ঘরেই লুটপাট ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর দেওয়া অপর এক ফেসবুক পোস্টে সারজিস আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন যে, দেশে আবারও একটি নতুন 'হাওয়া ভবন' তৈরি হচ্ছে এবং প্রভাবশালীরা হাজার কোটি টাকা লুটপাটে ব্যস্ত। তার এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জনগণের রক্ত-ঘামের টাকায় অর্জিত অর্থ শোষণের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতাই তৈরি করছে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলাকেও উসকে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারজিস আলমের এই বক্তব্যের বিপরীতে বিএনপি বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সারজিস আলমের এই মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে প্রশাসন পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের লাগামহীন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। সারজিস আলম যে ধরনের কঠোর সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছেন, তা মূলত রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি দাবি। তার এই বক্তব্য একইসাথে প্রশাসনের প্রতি একটি বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যাতে সরকারি বা বিরোধী দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাতে না পারে।
পরিশেষে, সারজিস আলমের এই বিস্ফোরক মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। যদি বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই বিশৃঙ্খলা এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে তা কেবল দলটির জন্য নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। জনমতের প্রতিফলন হিসেবে সারজিসের এই পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। ভবিষ্যতে দেশের পরিবহন, অর্থনীতি এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর এই রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও সংকুচিত করে ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।