সম্প্রতি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক পরিচালিত এক অভিযানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার একাধিক জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিবেশিত খাদ্যে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি বিদ্যমান। এই ঘটনা কেবল জনমনে আতঙ্কই সৃষ্টি করেনি, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশেষত, যখন BFSA-এর নিজস্ব ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অপ্রতুলতার কথা বারবার উঠে আসছে, তখন প্রশ্ন জাগে— ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে আমরা কি কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার শিকার, নাকি এর পেছনে রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও আন্তরিকতার অভাব?
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মূল ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার ব্যবস্থা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বর্তমানে প্রধানত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI), বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরির উপর নির্ভর করা হয়, পাশাপাশি BFSA-এর নিজস্ব ল্যাবরেটরিও সীমিত পরিসরে কাজ করছে। তবে, ২০২৩ সালের World Bank-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বিদ্যমান ফুড টেস্টিং ল্যাবগুলোর মাত্র ৩০% আন্তর্জাতিক মান ISO 17025 সনদপ্রাপ্ত, যা খাদ্য পরীক্ষার নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এই ল্যাবগুলোর অধিকাংশই মানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে না, যা পরিবেশ এবং ল্যাব কর্মীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়াও, অত্যাধুনিক স্পেকট্রোমিটার, মাস স্পেকট্রোমিটার, ক্রোম্যাটোগ্রাফি ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বায়োসেফটি লেভেল-৩ (BSL-3) সুবিধা সম্পন্ন ল্যাবরেটরিগুলোর সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই প্রযুক্তিগত ঘাটতি প্রায়শই ভেজালকারীর নিত্যনতুন কৌশল শনাক্ত করতে বাধা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যখন খাবারে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু বা জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত উপাদান (GMO) শনাক্তকরণের প্রয়োজন হয়। ফলস্বরূপ, ভেজালকারীরা শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যায়, এবং ভোক্তারা অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে বাধ্য হয়।
ল্যাবরেটরির সক্ষমতা কেবল আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দক্ষ মানবসম্পদ এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছা। Bangladesh Government-এর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২১-২০২৫) খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা থাকলেও, ADB-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানী, মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং রাসায়নিক বিশ্লেষকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রায়শই দেখা যায়, ল্যাবরেটরিগুলোতে একই টেকনিশিয়ানকে একাধিক ধরনের পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। তদুপরি, নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সুসংহত ডাটাবেজ সিস্টেমের অভাব রয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ল্যাবরেটরিগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ হলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় সেই তহবিল সঠিক সময়ে সঠিক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে World Bank-এর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত একটি অত্যাধুনিক ফুড টেস্টিং ল্যাবের যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় ধরে বাক্সবন্দী থাকার ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, যা সদিচ্ছার অভাবকেই প্রকটভাবে নির্দেশ করে। ল্যাবরেটরিগুলোর মধ্যে নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃল্যাব তুলনা পরীক্ষার (Inter-laboratory comparison tests) অনুপস্থিতি ফলাফলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা ভেজালবিরোধী অভিযান ও আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
| পরিদর্শিত খাত | মোট নমুনা | ভেজালযুক্ত নমুনা (%) | শনাক্তকৃত প্রধান ভেজাল | আদালতে বিচারাধীন মামলা (২০২৩) |
|---|---|---|---|---|
| দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য | ১১২০ | ৪৫% | ফরমালিন, স্টার্চ, অ্যান্টিবায়োটিক | ২৮০ |
| ফল ও সবজি | ৯৫০ | ৩৮% | কার্বাইড, কীটনাশক অবশিষ্টাংশ | ২২০ |
| মিষ্টি ও বেকারি পণ্য | ৭৮০ | ৩২% | টেক্সটাইল রঙ, স্যাকারিন | ১৫০ |
| মাংস ও মাছ | ৬৫০ | ২৫% | ফরমালিন, ভারী ধাতু | ১১০ |
| অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্য | ১৫০০ | ২৭% | মানহীন প্রিজারভেটিভ, ভেজাল তেল | ১৮০ |
উৎস: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' এর ৪৩ ধারা অনুযায়ী গঠিত জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা কমিটির নিয়মিত সভা আহ্বান করে এবং ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় কর্মপরিকল্পনা' তৈরি করবে, যেখানে World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক মান ISO 17025 সনদ প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিটি ফুড সেফটি ল্যাবে দক্ষ বিজ্ঞানী, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য একটি বিশেষ 'ক্যাডার সার্ভিস' চালু করবে এবং তাদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, যার জন্য 'বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল' (BARC) বা 'বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ' (BCSIR) এর সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন করবে।
- বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) একটি কেন্দ্রীয় 'ডিজিটাল ডাটাবেজ সিস্টেম' প্রতিষ্ঠা করবে, যা নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরীক্ষা ফলাফল প্রকাশ এবং আইনি পদক্ষেপ পর্যন্ত সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করবে, এবং এটি 'জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, ২০১২' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং ভেজাল খাদ্য মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।