শনিবার ৭ নভেম্বর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আগামী ডিসেম্বরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেছেন। অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ডিসেম্বরে যারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাদের মোকাবিলায় তারা পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে দমনের যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বিগত সময়ের উদারতাকে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে আগামী দিনে কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যা বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নাহিদ ইসলামের এই মন্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারের বিষয়টি এবং ছাত্র-জনতার গতানুগতিক সহনশীলতার সমাপ্তি। তিনি শহীদ ওসমান হাদির প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন যে, অতীতে শত্রুর সঙ্গেও যে ইনসাফ প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে, এবার সেই কৌশলের পরিবর্তন ঘটবে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফাঁসির মঞ্চে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত করার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, তা ভুক্তভোগী পক্ষগুলোর আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখলেও এর আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি যে রাজনৈতিক দর্শনের বয়ান দিয়েছেন, তাতে সমঝোতার চেয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির ইঙ্গিতই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম এবং সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এই ধরনের কড়া বার্তা প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এমন অবস্থানের বিপরীতে প্রশাসনের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কারণ গণতান্ত্রিক পরিসরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরনের সরাসরি হুমকি উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যদিও ছাত্রশক্তি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, তবে দলীয় নেতাদের এ জাতীয় কঠোর মন্তব্য একাডেমিক পরিবেশের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো মহল থেকে এই হুমকির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে জনমনে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, ডিসেম্বরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি সমঝোতার পথে থাকবে নাকি সংঘাতের দিকে মোড় নেবে।
পরিশেষে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য আগামী দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি আগাম সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডিসেম্বরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে যে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জনজীবন ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবি এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার হুমকি জাতীয় ঐক্যের পথে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা ও আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই এখন একমাত্র কাম্য, অন্যথায় এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।