২০২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামসের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের এবং পরবর্তীতে তাকে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই একটি ঘটনাই শুধু নয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (ডিএসএ) সারাদেশে ২,৭৬৯টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ২৩৪টি। এসব মামলায় অভিযোগের ধরন এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা বারবার প্রশ্ন তুলেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকারের ভবিষ্যৎ সত্যিই কি অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে চলেছে? বিশেষ করে, স্বাধীন সাংবাদিকতা যখন তথ্য প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি, তখন একটি বিতর্কিত আইনের প্রয়োগ জনমনে ভীতির সঞ্চার করছে এবং মুক্ত গণমাধ্যম চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, বাংলাদেশের তথাকথিত ডিজিটাল অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও, এর বেশ কিছু ধারা, বিশেষ করে ২৫ (আক্রমণাত্মক, ভীতি প্রদর্শক বা মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি), ২৮ (ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত), ২৯ (মানহানি) এবং ৩১ (আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটানোর অপরাধ ও দণ্ড) ধারার যথেচ্ছ ব্যবহার গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর খড়্গহস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারাগুলোর সংজ্ঞা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং বিস্তৃত, যা অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, 'মানহানিকর' বা 'আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটানোর মতো' তথ্য কী, তা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হওয়ায় অনেক সময় সরকারের সমালোচনা বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনও এই ধারার আওতায় পড়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) উভয়ই তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে মুক্ত গণমাধ্যম একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ডিএসএ’র বর্তমান প্রয়োগ পদ্ধতি এই লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের তথ্য অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে।
এই আইনের আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো, এর আওতায় দায়েরকৃত মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই না করেই মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বারবার আইনের অপপ্রয়োগ রোধে নির্দেশনা দিলেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশ সরকার যদিও এই আইনের অপপ্রয়োগের বিষয়টি স্বীকার করে এর সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু সংশোধিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া নিয়েও গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, নাম পরিবর্তন হলেও ধারাগুলোর মৌলিক প্রকৃতি অপরিবর্তিত থাকলে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হবে না। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, যেখানে নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে ডিএসএ’র মতো আইন সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে সাংবাদিকদের মধ্যে সেল্ফ-সেন্সরশিপের প্রবণতা বাড়িয়ে তথ্য অধিকারের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে। এর ফলে, জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সুশাসনের জন্য এক অশনি সংকেত।
| সাল | ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার সংখ্যা (মোট) | সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা | তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন |
|---|---|---|---|
| ২০১৮ (অক্টোবর-ডিসেম্বর) | ১১৮ | ৫ | ৫,৫৫০ |
| ২০১৯ | ১,১৮৯ | ৩২ | ৮,৭৬০ |
| ২০২০ | ১,১১৪ | ৪৮ | ১০,১২৫ |
| ২০২১ | ১,০৬১ | ৮১ | ১১,৮৫০ |
| ২০২২ | ৯৮৯ | ৬২ | ১৩,০২০ |
| ২০২৩ (জানুয়ারি-জুন) | ৪৫০ | ১৬ | ৭,২০০ |
উৎস: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর।
সুপারিশ
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর বিতর্কিত ধারা ২৫, ২৮, ২৯ এবং ৩১-এর অস্পষ্টতা দূর করে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রণয়ন করা উচিত, যাতে এর অপপ্রয়োগের সুযোগ না থাকে। এক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়) কর্তৃক একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মানবাধিকার সনদসমূহের আলোকে আইনটির সংস্কার করা যেতে পারে।
- সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের পূর্বে প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক প্রাথমিক তদন্ত বাধ্যতামূলক করা এবং কেবল প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রেই মামলা গ্রহণের ব্যবস্থা করা। এটি অহেতুক হয়রানি রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
- তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর কার্যকারিতা বাড়াতে এবং এর প্রয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করা। পাশাপাশি, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষিত করা এবং তথ্য প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা ও অনীহা দূর করতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।