চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানা এলাকায় সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে উসকানি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের মশাল মিছিলে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দর্শনা পৌর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফলেহার হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার ভোররাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত ফলেহার হোসেন রামনগর গ্রামের মৃত রমজান মন্ডলের ছেলে। গত ৩ সেপ্টেম্বর দর্শনা থানা এলাকায় সংঘটিত ওই মশাল মিছিলের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মূলত রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আয়োজিত ওই মিছিলটি স্থানীয় রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা আত্মগোপনে ছিলেন, তবে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত অপর পাঁচজন হলেন মো. ঝন্টু, লিটন, মোতালেব হোসেন, লিমন ওরফে আলফাজ এবং শাওন ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্ট থাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দর্শনা এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে, যা সাধারণ মানুষের জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মশাল মিছিলের সময় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি শুরু করে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এসব ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ বরাবরই ভীতসন্ত্রস্ত ছিল, যার ফলে প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষই পেতেন। এই গ্রেফতারের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এলেও, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীদের মূল নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় কি না, তা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যানারে যে মশাল মিছিল বের করা হয়েছিল, তা ছিল সরাসরি সরকারবিরোধী এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিপন্থী। এই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ফলেহার হোসেনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধে পুলিশের এই বিশেষ অভিযান চলমান থাকবে এবং যেকোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা হবে। রোববার দুপুরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে গ্রেফতারকৃত ছয়জনকে চুয়াডাঙ্গা বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই গ্রেফতারের ঘটনা চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্বের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধ সংগঠনের এই সংস্কৃতি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দর্শনা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা নাশকতামূলক তৎপরতা রোধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।