চাঁদপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা বাবুরহাট বাজারে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে তিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট দুপুরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের নেতৃত্বে এই নিয়মিত বাজার তদারকি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে দেখা যায়, নিউ ইমরান স্টোর কোনো প্রকার উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়াই অনুমোদনহীন নিম্নমানের শিশু খাদ্য বিক্রি করছিল, যা কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। একইসাথে, স্থানীয় ওলি উল্লাহ স্টোরে জিলাপি তৈরির সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান হাইড্রোজের ব্যবহার হাতেনাতে ধরা পড়ে। এছাড়া জানকি মেডিকেল হলের মালিক বিপ্লব আচার্য্য কোনো প্রকার এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন না করা সত্ত্বেও নামের আগে ভুয়া ‘ডা.’ পদবি ব্যবহার করে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলেন এবং দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় এই তিন প্রতিষ্ঠানকে যথাক্রমে ১০ হাজার, ২ হাজার এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বাবুরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের একাংশ দীর্ঘ দিন ধরেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভোক্তা ঠকানোর এই অপকৌশল চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যপণ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে অনিয়ম সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী ক্রেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী নিয়মিত এমন অপরাধ করার সাহস পায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সচেতন ক্রেতা জানান, নামসর্বস্ব ডাক্তার ও ভেজাল পণ্যের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ওষুধের দোকানে ভুয়া পদবি ব্যবহার করে রোগীদের ভুল চিকিৎসা দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ব্যবসায়ীরা জরিমানা দেওয়ার সময় ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও নিয়মিত তদারকির অভাবে এই অনিয়ম পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ইমরান জানিয়েছেন, জনস্বার্থ রক্ষায় এই অভিযান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। অভিযানে অভিযুক্তরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেছেন। তবে শুধুমাত্র জরিমানা করে দায় সারলে এই অসাধু চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানে ব্যবসায়ীদের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে এবং তাদের নিয়ম মেনে ব্যবসার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাবুরহাটসহ পুরো জেলার বাজারগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো ব্যবসায়ী যদি জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন বা ভোক্তা ঠকানোর মতো অপরাধে পুনরায় লিপ্ত হন, তবে তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাবুরহাট বাজারের এই ঘটনাটি মূলত খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের নাজুক পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভেজাল মেশানো এবং ভুয়া পদবি ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার মতো অপরাধগুলো সামাজিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হলে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি এবং সচেতন নাগরিকদের কঠোর ভূমিকা পালন করা জরুরি। প্রশাসনের নজরদারি যদি কেবল জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা পুনরায় তাদের পুরোনো ব্যবসায়িক কৌশলে ফিরে যাবে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতাকে আরও বিস্তৃত করা সময়ের দাবি, যেন ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন প্রতারণার দুঃসাহস দেখানোর আগে অন্তত দুবার চিন্তা করে।