শনিবার রাজধানীর ধোলাইখালে আয়োজিত এক জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে যাতে বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এই সমাবেশে মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও খুনিদের কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না এবং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে। দেশের গণতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার যে নজির বিগত সরকার স্থাপন করেছে, তার বিচারিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।
জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গত দেড় দশকে যারা বিনা ভোটে দেশ পরিচালনা করেছে এবং জনগণের বুকে গুলি চালিয়েছে, তারা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অপরাধী। তিনি অভিযোগ করেন যে, পলাতক শেখ হাসিনাসহ অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে সুষ্ঠু বিচারের মুখোমুখি করার দাবিটি এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশে ফিরে এলে আসামিরা আইন অনুযায়ী আপিলের সুযোগ পাবেন, যা ন্যায়বিচারের মানদণ্ডকে সমুন্নত রাখবে। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে অপচেষ্টা চলছে, সে বিষয়েও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
সরকারের সাত মাসের কার্যক্রমের সমালোচনা এবং লং মার্চের ঘোষণার প্রেক্ষিতে সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তুলেছেন যে, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এমন কী ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে যার জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। তিনি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার রোধে সরকার বাধ্য হয়ে সীমিত পরিসরে দাম সমন্বয় করেছে। তার দাবি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও সেই সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণ না করে অগণতান্ত্রিক পথে লং মার্চের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করায় তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সমালোচনা করেন এবং দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাইকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ফেরার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার চাপ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ সামলানো বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সংখ্যা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনলেও, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব ফেলে এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত বিচারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে এই সরকারের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।