ওষুধ শিল্পের নতুন দিগন্ত: এপিআই উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

ফারহান তানভীর  avatar   
ফারহান তানভীর
ওষুধ শিল্পের নতুন দিগন্ত: এপিআই উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ওষুধ শিল্পের নতুন দিগন্ত: এপিআই উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) দেশের চারটি বৃহৎ ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) উৎপাদনে পরীক্ষামূলক অনুমোদ...

সম্প্রতি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) দেশের চারটি বৃহৎ ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) উৎপাদনে পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে, যা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই অনুমোদন কেবল স্থানীয় চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ফিনিশড ডোজ ফর্মুলেশন উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম প্রধান দেশ হলেও, এর মূল কাঁচামাল, অর্থাৎ এপিআই-এর জন্য প্রায় ৯৫% আমদানির উপর নির্ভরশীল ছিল। এই নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঔষধ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি তৈরি করে। কোভিড-১৯ মহামারীকালে এই দুর্বলতা বিশেষভাবে প্রকট হয়েছিল, যখন চীন ও ভারতের মতো প্রধান এপিআই সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানি সীমিত করে দেয়, ফলে স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান বাজার প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৮০% স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এবং প্রায় ১৫০টিরও বেশি দেশে ঔষধ রপ্তানি করা হয়। তবে, এই সাফল্যের মূলে থাকা এপিআই আমদানিনির্ভরতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সরকার এই সমস্যা নিরসনে 'অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) শিল্প পার্ক' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যা মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমির উপর নির্মিত হচ্ছে। এই পার্কে প্লট বরাদ্দ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে, দেশীয় এপিআই উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা যেমন, শুল্ক সুবিধা, কর অবকাশ এবং ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই উদ্যোগকে সফল করতে বিভিন্ন নীতি সহায়তা প্রদান করছে, যার লক্ষ্য হলো আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট এপিআই চাহিদার ৫০% স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা। এটি অর্জিত হলে, দেশের ওষুধ শিল্প কেবল কাঁচামাল আমদানির উপর চাপ কমাবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের বায়োটেকনোলজি গবেষণায়ও সহায়ক হবে।

এপিআই উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, এপিআই উৎপাদন একটি অত্যন্ত পুঁজি-নিবিড় এবং প্রযুক্তি-নির্ভর প্রক্রিয়া। এর জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, দক্ষ জনবল এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক নির্ধারিত গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (GMP) এবং গুড ল্যাবরেটরি প্র্যাকটিস (GLP) মান বজায় রাখা জরুরি, যা নিশ্চিত করতে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি যদিও গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে এপিআই গবেষণায় তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা সীমিত। এই প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে উৎপাদন খরচ কমানো এবং গুণগত মান বজায় রাখা অপরিহার্য। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো ব্যাপক উৎপাদন ক্ষমতা এবং কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এপিআই সরবরাহে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এপিআই উৎপাদনে রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং কঠোর পরিবেশগত নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক, যা টেকসই শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য।

সূচক ২০১৫ ২০২০ ২০২২ লক্ষ্য (২০৩০)
ওষুধ শিল্পের মোট বাজার মূল্য (বিলিয়ন USD) ১.৫ ২.৮ ৩.৫ ৬.০ (আনুমানিক)
এপিআই আমদানিনির্ভরতা (%) ৯৭% ৯৬% ৯৫% ৫০% (কমানো)
এপিআই শিল্প পার্কের প্লট বরাদ্দ (%) ০% ২০% ৫০% ১০০%
রপ্তানি আয় (মিলিয়ন USD) ৭০ ১৪০ ১৯০ ৫০০ (আনুমানিক)

উৎস: বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (BAPI), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)

সুপারিশ

  • API শিল্প পার্কে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সকল ইউটিলিটি সরবরাহ নিশ্চিত করে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন শুরু করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই লক্ষ্যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
  • দেশীয় এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের GMP (Good Manufacturing Practice) এবং GLP (Good Laboratory Practice) মান অর্জনে সহায়তা করার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ 'প্রযুক্তি ও মানোন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ফি এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান প্রদান করা যেতে পারে।
  • এপিআই গবেষণায় সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর সাথে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) অংশীদারিত্ব স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নতুন এপিআই উদ্ভাবন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে, যার জন্য DGHS (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান তানভীর

ফারহান তানভীর 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator