সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নীতি সুদহার (Repo Rate) ৬.৫০% থেকে ৮.৫০%-এ উন্নীত করার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গৃহঋণের সুদহার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছে, যা মধ্যবিত্তের আবাসন স্বপ্নকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশেষত, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলেও এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আবাসন খাতের বন্ধকী ঋণের ওপর। অনেক ব্যাংক বর্তমানে ৯.৫০% থেকে শুরু করে ১২% পর্যন্ত সুদে গৃহঋণ দিচ্ছে, যা গত এক দশকে সর্বনিম্ন সুদহারের সুবিধাভোগী মধ্যবিত্তদের জন্য এক নতুন সংকট তৈরি করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন ঋণ গ্রহীতাদের মাসিক কিস্তি (EMI) প্রায় ১৫-২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং আবাসন খাতে বিনিয়োগে মন্দা সৃষ্টি করছে।
আবাসন খাতের এই সংকট কেবল নতুন ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চলমান বন্ধকী ঋণ পরিশোধকারীদের জন্যও এটি একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক ভাসমান সুদহার (floating interest rate) নীতি অনুসরণ করায়, নীতি সুদহার বৃদ্ধির সাথে সাথে পুরনো ঋণের কিস্তিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যিনি পাঁচ বছর আগে ৭-৮% সুদে ২০ লক্ষ টাকার গৃহঋণ নিয়েছিলেন, তাকে এখন ১০-১১% সুদে মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা তার পারিবারিক বাজেটকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। এই অপ্রত্যাশিত ব্যয় বৃদ্ধি অনেক পরিবারকে তাদের অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আপস করতে বাধ্য করছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (REHAB) এর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে আবাসন খাতে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৩০% কমেছে, যা এই উচ্চ সুদের হারের প্রত্যক্ষ ফল। একইসাথে, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডেভেলপাররাও নতুন প্রকল্প শুরু করতে দ্বিধা করছেন, ফলে কর্মসংস্থানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সূত্রে জানা যায়, আবাসন খাতে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন থেকে রাজস্ব আদায় গত অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও বাধা সৃষ্টি করছে।
যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, তবে আবাসন খাতের মতো শ্রমঘন ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি সেক্টরের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অপরিহার্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর যৌথ উদ্যোগে রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REIT) এর মতো নতুন আর্থিক পণ্য চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এর বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মধ্যবিত্তের জন্য সহজলভ্য হয়নি। বর্তমানে, দেশের আবাসন খাতের প্রায় ৮০% অর্থায়ন আসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে, যেখানে উচ্চ সুদহার সরাসরি প্রভাব ফেলে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ সামগ্রীর রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি থাকলেও, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীরাও সংকটে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা এবং মধ্যবিত্তের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ আবাসন ঋণ প্রকল্প চালু করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, আবাসন খাত ধীরে ধীরে স্থবিরতার দিকে ধাবিত হবে এবং অর্থনীতিতে এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
| সূচক | ২০২২ সাল (জুলাই-ডিসেম্বর) | ২০২৩ সাল (জুলাই-ডিসেম্বর) | পরিবর্তন (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| গৃহঋণের গড় সুদহার | ৮.৫০% | ১১.০০% | +২৯.৪১% |
| ফ্ল্যাট বিক্রির পরিমাণ (ইউনিট) | ১০,৫০০ | ৭,৩০০ | -৩০.৪৮% |
| আবাসন খাতে নতুন প্রকল্প অনুমোদন | ২৫০ | ১৫০ | -৪০.০০% |
| জমির রেজিস্ট্রেশন থেকে রাজস্ব (কোটি টাকা) | ১,৮৫০ | ১,৪০০ | -২৪.৩২% |
| নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য সূচক | ১৫৫.০ | ১৬৮.৫ | +৮.৭০% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, REHAB, NBR, CPD
সুপারিশ
- বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক একটি 'গৃহঋণ স্থিতিশীলতা তহবিল' গঠন করা হোক, যা থেকে মধ্যবিত্তের জন্য নির্ধারিত সিলিং (যেমন: ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত) ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯% সুদহার নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকি প্রদান করা যেতে পারে। এটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩) এর আওতায় বিশেষ নীতি হিসেবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর তত্ত্বাবধানে রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REIT) এর কাঠামোকে আরও সহজ ও মধ্যবিত্তের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও আবাসন খাতে স্বল্প পরিমাণে বিনিয়োগ করে সুফল পেতে পারেন এবং আবাসন খাতের জন্য বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি হয়।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর মাধ্যমে আবাসন খাতে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি এবং অন্যান্য কর কমানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (যেমন: আগামী ২ বছর) বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক, যা ফ্ল্যাট ও জমির ক্রয়-বিক্রয়কে উৎসাহিত করবে এবং আবাসন খাতের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।