সম্প্রতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) আয়োজিত 'জাতীয় ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতা ২০২৩'-এ প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণ দেশের মোবাইল গেমিং ও ই-স্পোর্টস খাতের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি বিনোদনমূলক আয়োজন ছিল না, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে, দেশের তরুণ সমাজ গেমিংকে নিছক অবসর কাটানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে একটি পেশাদার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করতে শুরু করেছে। এই বিপুল অংশগ্রহণ গেমিং ইকোসিস্টেমের দ্রুত বিকাশের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বিনোদন এবং পেশাদারিত্বের মধ্যেকার রেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ, যাদের মধ্যে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য মতে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এই বিশাল ব্যবহারকারী গোষ্ঠী মোবাইল গেমিংয়ের প্রসারে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক গেমিং বাজার যেখানে বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে এই খাতের সম্ভাবনাকে কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং, এটি প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যদি সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে একে সমর্থন করা হয়।
তবে, এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। গেমিংকে এখনও মূলধারার পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সমাজের একাংশের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। গেমিং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার অভাব, পেশাদার প্রশিক্ষণের অপ্রাপ্যতা, এবং স্থানীয় গেমিং স্টুডিওগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তার অভাব এই খাতকে পূর্ণাঙ্গ বিকাশে বাধা দিচ্ছে। যদিও কিছু বেসরকারি উদ্যোগ ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে এবং গেমিং স্টুডিও গড়ে তুলছে, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ-এর পক্ষ থেকে সমন্বিত একটি জাতীয় ই-স্পোর্টস কৌশল প্রণয়ন এই খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। World Bank-এর 'Digital Bangladesh' ভিশন বাস্তবায়নে গেমিং ও ই-স্পোর্টস খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশের তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
| বিষয় | ২০২০ | ২০২৩ (আনুমানিক) | ২০২৭ (প্রক্ষেপণ) |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশের মোবাইল গেমিং বাজারের আকার (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ৬০০ | ৯৫০ | ১,৪০০ |
| ই-স্পোর্টস দর্শক সংখ্যা (মিলিয়ন) | ৩.৫ | ৬.২ | ১০.৫ |
| গেমিং সম্পর্কিত কর্মসংস্থান (হাজার) | ৫ | ১০ | ২০ |
| মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) | ৯.৭৯ | ১২.৫৬ | ১৪.০০ |
উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), World Bank, ও বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিবেদন (অনুমান নির্ভর)।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার-এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে 'জাতীয় ই-স্পোর্টস নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ই-স্পোর্টসকে একটি স্বীকৃত খেলা ও পেশা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সুরক্ষার বিধান থাকবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেমিং ডেভেলপমেন্ট, ই-স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল অ্যানিমেশন বিষয়ে ডিপ্লোমা ও স্নাতক পর্যায়ের কোর্স চালু করতে হবে, যা এই খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সমন্বয়ে গেমিং এবং ই-স্পোর্টস শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ, যেমন – কর অবকাশ, সহজ শর্তে ঋণ, এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে সরলীকৃত রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যা স্থানীয় গেম ডেভেলপার ও ই-স্পোর্টস দলগুলোকে উৎসাহিত করবে।