ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ওয়েব৩ প্রযুক্তি কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রবণতা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, ডিজিটাল শাসন এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা করে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা এই উদীয়মান খাতে দেশে একটি নিয়ন্ত্রক শূন্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন অর্থ পাচার এবং সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যে প্রণীত, তেমনি অন্যদিকে এটি ব্লকচেইন এবং ওয়েব৩ প্রযুক্তির উদ্ভাবনী ব্যবহারের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) এবং বিকেন্দ্রীভূত পরিচয় (Decentralized Identity) ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো বৈশ্বিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এই নিয়ন্ত্রক কঠোরতা সত্ত্বেও, ব্লকচেইন প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে স্বীকৃতি দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) ব্লকচেইন প্রযুক্তির একটি জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি সুরক্ষিত, স্বচ্ছ এবং কার্যকর ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই কৌশলপত্রটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সরকারি পরিষেবাগুলোতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা, যেমন ভূমি নিবন্ধন, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণ। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) ব্লকচেইন ভিত্তিক স্টার্টআপ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট হাই-টেক পার্কগুলোতে বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়েও বিবেচনা করছে। বর্তমানে, দেশের কিছু ফিনটেক কোম্পানি রেমিট্যান্স এবং ক্রস-বর্ডার পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্লকচেইন ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে, যদিও ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর নিষেধাজ্ঞা তাদের কার্যক্রমকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর মতে, দেশের প্রায় ৫০টিরও বেশি সফটওয়্যার কোম্পানি ব্লকচেইন ভিত্তিক সমাধান নিয়ে কাজ করছে, যার মধ্যে কিছু কোম্পানি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করে, যা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছে।
তবে, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ওয়েব৩-এর বৃহত্তর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে একটি সুসংহত এবং বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম, যা ডিজিটাল সরকারি পরিষেবা প্রদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তারা ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ডিজিটাল সার্টিফিকেট এবং ডিগ্রি যাচাইকরণ ব্যবস্থা, যা জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক বারবার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগাতে এবং একই সাথে ক্রিপ্টোকারেন্সির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। বর্তমানে, বাংলাদেশের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের উপর নজরদারি বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতে একটি নিয়ন্ত্রিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার খোলার পথ প্রশস্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি সমন্বয় সাধন করতে না পারলে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
| সূচক | ২০২২ সাল | ২০২৩ সাল | উৎস |
|---|---|---|---|
| ব্লকচেইন ভিত্তিক স্টার্টআপের সংখ্যা (BASIS নিবন্ধিত) | ৩২টি | ৫০+টি | BASIS বার্ষিক প্রতিবেদন |
| সরকারি ব্লকচেইন পাইলট প্রকল্প (ICT Division) | ৩টি | ৫+টি | ICT Division কৌশলপত্র |
| ব্লকচেইন প্রযুক্তিবিদদের চাহিদা বৃদ্ধি | ১৫% | ২৫% | লিঙ্কডইন জব মার্কেট অ্যানালাইসিস |
| ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণের বৈশ্বিক সূচকে অবস্থান | ১০১তম | ৮৭তম | চেইনঅ্যানালাইসিস গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডপশন ইনডেক্স |
| হাই-টেক পার্ক ব্লকচেইন বিনিয়োগ (BHTPA ঘোষিত) | ০ | $২ মিলিয়ন (প্রস্তাবিত) | BHTPA বিনিয়োগ পরিকল্পনা |
উৎস: BASIS, ICT Division, লিঙ্কডইন, চেইনঅ্যানালাইসিস, BHTPA
সুপারিশ
- একটি সুনির্দিষ্ট 'ব্লকচেইন ও ডিজিটাল সম্পদ আইন' প্রণয়ন করা, যেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি, নন-ফাঞ্জিবল টোকেন (NFTs) এবং বিকেন্দ্রীভূত স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা (DAOs)-এর আইনি স্বীকৃতি, কর কাঠামো এবং লেনদেন নীতিমালা স্পষ্ট করা হবে। এই আইনটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি-এর সমন্বয়ে প্রণীত হওয়া উচিত, যাতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও উদ্ভাবন উভয়ই সুরক্ষিত থাকে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'জাতীয় ব্লকচেইন স্যান্ডবক্স' প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ফিনটেক স্টার্টআপ এবং গবেষকরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ অ্যাপ্লিকেশন পরীক্ষা করতে পারবে। এই স্যান্ডবক্সের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিটিআরসি থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রক ছাড়পত্র প্রদান করা উচিত, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।
- বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর সহযোগিতায় ব্লকচেইন এবং ওয়েব৩ প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও বৃত্তি চালু করা। এই কর্মসূচিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগগুলোকে যুক্ত করে কারিকুলাম আধুনিকীকরণ এবং গবেষণা ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা উচিত।