সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর আস্থার সংকট উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০% উত্তরদাতা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন, যা গত দশকের গড় আস্থার হারের চেয়ে প্রায় ১৫% বেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক ভিত্তি — জনআস্থা ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার উপর একটি গভীর প্রশ্নচিহ্ন। যখন একটি জাতির অধিকাংশ নাগরিক তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েই সন্দিহান থাকে, তখন এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে শাসন ব্যবস্থা ও সামগ্রিক সামাজিক সংহতির উপর।
এই আস্থার সংকটের মূলে রয়েছে নির্বাচনকালীন বিভিন্ন অনিয়ম, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের অভাব এবং নির্বাচনী আইন প্রয়োগে দুর্বলতা। নির্বাচন কমিশন, যা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করার কথা, তাদের কার্যকারিতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলো কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে নয়, বরং সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো থেকেও এসেছে। এই ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয় এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং স্বচ্ছতার অভাবও এই সংকটকে আরও গভীর করছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা দল ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ প্রায় অনুপস্থিত। এই পরিস্থিতি শুধু নির্বাচনকালীন সময়েই নয়, বরং আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। যখন জনগণের স্বার্থে নীতি প্রণয়নের চেয়ে দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। উপরন্তু, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতিও জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব বিষয় সম্মিলিতভাবে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সত্য ও মিথ্যের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং জনমত সহজে প্রভাবিত হয়।
| সূচক | ২০১৩ | ২০১৮ | ২০২৩ |
|---|---|---|---|
| নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা (শতাংশ) | ৬২% | ৪৫% | ৩০% |
| রাজনৈতিক স্বচ্ছতা সূচক (১০০ এর মধ্যে) | ৫০ | ৪৩ | ৩৬ |
| নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা বিষয়ক জনসন্তুষ্টি (শতাংশ) | ৫৮% | ৪৩% | ২৮% |
| World Bank এর 'Governance Indicators: Voice and Accountability' স্কোর (-২.৫ থেকে ২.৫) | -০.৪৫ | -০.৭৮ | -০.৯২ |
উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, Transparency International Bangladesh, World Bank Governance Indicators (বিভিন্ন বছরের রিপোর্ট থেকে সংকলিত)।
সুপারিশ
- নির্বাচন কমিশনকে (EC) শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আইন, ২০০৯ এর অধীনে কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে তার কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
- রাজনৈতিক দলসমূহের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন, ২০০৮ এর ধারা ৯(২) অনুযায়ী দলগুলোর গঠনতন্ত্রে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে দলের সকল স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করে জনসম্মুখে প্রকাশ করার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
- তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ: তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে জনগণের কাছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ADB ও World Bank-এর সুশাসন সংক্রান্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষ করে সরকারি ক্রয়ে E-procurement পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে।