এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে স্মার্টফোন, ডিজিটাল বৈষম্যের সমাধান না নতুন সংকট? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে স্মার্টফোন, ডিজিটাল বৈষম্যের সমাধান না নতুন সংকট?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে স্মার্টফোন, ডিজিটাল বৈষম্যের সমাধান না নতুন সংকট?
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে স্মার্টফোন, ডিজিটাল বৈষম্যের সমাধান না নতুন সংকট?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার গত পাঁচ বছরে প্রা...

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের কৃষিবিষয়ক তথ্য প্রাপ্তি এবং বাজার সংযোগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশের কৃষি খাতের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছে, তেমনি অন্যদিকে এ প্রশ্নও উত্থাপন করছে যে, এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব কি সত্যিই ডিজিটাল বৈষম্যের সমাধান করছে, নাকি নতুন কোনো সংকটের জন্ম দিচ্ছে?

ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং এসএমএস ভিত্তিক সেবার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে উন্নত জাতের বীজ, সার প্রয়োগের সঠিক মাত্রা, পোকামাকড় দমন পদ্ধতি এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, BRRI-এর 'ধানের ডাক্তার' অ্যাপ কৃষকদের ফসলের রোগ ও পোকা শনাক্তকরণে সহায়তা করছে, যা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত ও নির্ভুল। এই ধরনের প্রযুক্তি কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং অপচয় কমাতে সাহায্য করছে, যা তাদের আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অধিকন্তু, স্মার্টফোন ভিত্তিক বাজার প্ল্যাটফর্মগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করছে, যা কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করছে।

তবে, এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের আড়ালে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু গভীর সংকট। দেশের সকল ক্ষুদ্র কৃষক এখনও স্মার্টফোন ব্যবহার বা ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের সুযোগ পান না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকার প্রায় ২০% কৃষকের ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনও অত্যন্ত নিম্নমানের, যা তাদের স্মার্টফোন ও অ্যাপভিত্তিক সেবা ব্যবহারে বড় বাধা। উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ডেটা, বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব এবং দুর্বল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চলে, ডিজিটাল বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের কাছে স্মার্টফোন পৌঁছালেও, দুর্যোগকালীন সময়ে বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক বিভ্রাটের কারণে তারা প্রায়শই জরুরি তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া, স্মার্টফোন ব্যবহারের খরচ, ডিভাইসের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন অ্যাপের জটিলতা অনেক বয়স্ক কৃষকের জন্য এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বছর গ্রামীণ এলাকায় স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কৃষক (%) কৃষিবিষয়ক অ্যাপ ব্যবহারকারী কৃষক (%) ডিজিটাল সাক্ষরতা (%) (গ্রামীণ) ইন্টারনেট অ্যাক্সেস (%) (গ্রামীণ)
২০১৮ ৩২.৫% ১০.৮% ৬২.০% ৪৯.২%
২০২১ ৫১.২% ২৫.৪% ৬৫.৫% ৬১.৮%
২০২৪ (প্রাক্কলিত) ৬৭.৮% ৩৯.১% ৭১.২% ৭৩.১%

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে 'ডিজিটাল কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করা হোক, যেখানে DAE-এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা BARI ও BRRI-এর বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কৃষকদের স্মার্টফোন ব্যবহার, কৃষি অ্যাপস পরিচালন এবং অনলাইন বাজার প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করবেন। এই কর্মসূচিতে বিশেষ করে বয়স্ক ও নারী কৃষকদের জন্য সহজবোধ্য মডিউল অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় এর সমন্বয়ে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায়, বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে, সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার জন্য একটি 'কৃষি-বান্ধব নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ নীতি' প্রণয়ন করা হোক। এই নীতির আওতায় সৌরশক্তি চালিত বেস স্টেশন স্থাপন এবং স্থানীয় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর নেতৃত্বে একটি 'এগ্রি-টেক ইনোভেশন ফান্ড' গঠন করা হোক, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় ভাষায় সহজবোধ্য এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব কৃষি অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল টুলস তৈরিতে গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে। এই তহবিলের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভাবকদের সহায়তা প্রদান এবং বিদ্যমান অ্যাপসগুলোর নিয়মিত হালনাগাদ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator