সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে (CCMS) জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে যেখানে মোট অভিযোগের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার, সেখানে ২০২৩ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে এই সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ অভিযোগই পণ্য ডেলিভারি সংক্রান্ত জালিয়াতি, যেমন - ভুল পণ্য পাঠানো, পণ্যের গুণগত মান নিয়ে অসঙ্গতি, কিংবা অর্ডারকৃত পণ্য সম্পূর্ণভাবে সরবরাহ না করা। এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকদের আস্থা সংকটের তীব্রতা নির্দেশ করে, তেমনি ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে, যা কেবল ডেলিভারি জালিয়াতির ফল, নাকি গ্রাহকের সচেতনতার অভাবও এর জন্য দায়ী, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ডিজিটাল কমার্স বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। বিশেষত, এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো (ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা) যেখানে প্রায় ৫০ হাজার উদ্যোক্তা জড়িত, সেখানে লেনদেনের কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারণার ঘটনা বেশি ঘটছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক ডিজিটাল ওয়ালেট বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিলেও, ক্ষুদ্র এফ-কমার্স বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখনো নগদ লেনদেন বা ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা তাদের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এই অসংগঠিত খাতের কারণে একদিকে যেমন সরকার NBR এর মাধ্যমে যথাযথ রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহকরাও প্রতারিত হলে আইনগত প্রতিকার পেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
গ্রাহকের অসচেতনতাও এই আস্থা সংকটের একটি বড় কারণ। অনেক সময় গ্রাহকরা লোভনীয় অফার বা অস্বাভাবিক কম মূল্যের পণ্যের ফাঁদে পা দেন, যা পরবর্তীতে ডেলিভারি জালিয়াতির সুযোগ তৈরি করে। যেমন, একটি ব্র্যান্ডেড স্মার্টফোন অস্বাভাবিক কম দামে দেখে অর্ডার করা হয়, কিন্তু ডেলিভারির সময় একটি নকল বা ভাঙা পণ্য পাঠানো হয়। সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ অনলাইন ক্রেতা পণ্য কেনার আগে বিক্রেতার রিভিউ বা রেটিং যাচাই করেন না এবং প্রায় ৩০ শতাংশ ক্রেতা পণ্য ফেরত বা বিনিময় নীতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। তাছাড়া, EPB (Export Promotion Bureau) এর তত্ত্বাবধানে ই-কমার্স রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও, অভ্যন্তরীণ বাজারের বিক্রেতা ও ক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, বিক্রেতারা পণ্যের সঠিক বিবরণ, ছবি বা স্পেসিফিকেশন প্রদান করেন না, যা গ্রাহকদের ভুল তথ্য দিয়ে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করে এবং পরে অসঙ্গতি দেখা দিলে আস্থা সংকট আরও বাড়ে। এই সম্মিলিত ব্যর্থতা ই-কমার্স খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| বছর | মোট অভিযোগ (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, CCMS) | ডেলিভারি সংক্রান্ত অভিযোগের হার (%) | ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন টাকা) | ই-কমার্স বাজারের প্রবৃদ্ধি (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৬,৫০০ | ৪৫ | ১২০ | ২০ |
| ২০২১ | ১৫,০০০ | ৫২ | ১৮০ | ৩০ |
| ২০২২ | ২০,০০০ | ৫৮ | ২৫০ | ২৫ |
| ২০২৩ (প্রাক্কলিত) | ৩০,০০০+ | ৬০+ | ৩৩০ | ৩২ |
উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (CCMS), ই-ক্যাব, CPD
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি কার্যকর ডিজিটাল কমার্স আইন প্রণয়ন করতে হবে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উভয় প্ল্যাটফর্মের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বিক্রেতা নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করবে, যাতে গ্রাহকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
- NBR কে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এফ-কমার্স বিক্রেতাদের জন্য একটি সরলীকৃত অনলাইন ট্যাক্স নিবন্ধন ও পরিশোধ ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং BSEC এর সাথে সমন্বয় করে সকল ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রতারণামূলক লেনদেন ট্র্যাক করা সহজ হয়।
- CPD ও EPB কে যৌথভাবে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে, যেখানে পণ্য যাচাই, রিভিউ পদ্ধতি, রিটার্ন পলিসি এবং ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করা হবে।