ইডটেক ও অনলাইন এডুকেশন: গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল বিভাজন কমানোর কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইডটেক ও অনলাইন এডুকেশন: গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল বিভাজন কমানোর কৌশল

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
ইডটেক ও অনলাইন এডুকেশন: গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল বিভাজন কমানোর কৌশল
ইডটেক ও অনলাইন এডুকেশন: গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল বিভাজন কমানোর কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২.৭৯ কোটি ছাড়িয়...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২.৭৯ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১১.৬৬ কোটি। এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক হলেও, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা ও এডটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার যেখানে প্রায় ৭০%, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় এই হার মাত্র ৪০%। এই ডিজিটাল বিভাজন কমানোর লক্ষ্যে সরকার এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এডটেক সেক্টরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যদি সঠিক কৌশল অবলম্বন করা হয়।

গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার কম হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চগতির ইন্টারনেটের অভাব, ডিভাইস স্বল্পতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার নিম্নহার। যদিও BTRC ফোর-জি (4G) সেবার পরিধি বাড়াতে কাজ করছে, এখনো অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া দুঃসাধ্য। এটুআই (a2i) কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে স্থাপিত প্রায় ৮,৫০০টি ডিজিটাল সেন্টার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে ইন্টারনেট ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যক্তিগত ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ ও ইন্টারনেটের ব্যয়ভার বহন করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩০০টিরও বেশি এডটেক স্টার্টআপ সক্রিয় রয়েছে, যারা বৈচিত্র্যপূর্ণ অনলাইন কোর্স অফার করছে। তবে, এসব প্ল্যাটফর্মের বেশিরভাগই শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত এবং তাদের বিষয়বস্তু ও ইন্টারফেস গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য, স্থানীয় ভাষার উপযোগী এবং অফলাইন মোডে কাজ করতে সক্ষম এমন এডটেক সমাধানের প্রয়োজন, যা ডিভাইস স্বল্পতার চ্যালেঞ্জকেও মোকাবেলা করতে পারে।

ডিজিটাল বিভাজন কমানোর জন্য কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে। বর্তমানে, সারাদেশে প্রায় ১৩,০০০ এর বেশি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপিত হয়েছে। এই ল্যাবগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা জরুরি, যাতে তারা এডটেক টুলস ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো শ্রেণীকক্ষে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। এছাড়াও, বিএইচটিপিএ-এর মাধ্যমে পরিচালিত ইনোভেশন হাবগুলো গ্রামীণ উদ্ভাবকদের এডটেক সমাধান তৈরিতে উৎসাহিত করতে পারে, যা স্থানীয় সমস্যা সমাধানের জন্য উপযোগী হবে। মোবাইল অপারেটরদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্যে ডেটা প্যাকেজ এবং এডটেক প্ল্যাটফর্মগুলিতে ফ্রি অ্যাক্সেস প্রদান করা যেতে পারে, যা অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের আর্থিক বাধা কমাতে সাহায্য করবে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রথম কোয়ার্টার)
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ১০.৩২ ১১.৮৭ ১২.৬১ ১২.৭৯
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ৯.৫৭ ১০.৯৯ ১১.৬২ ১১.৬৬
৪জি (4G) কভারেজ (আনুমানিক শতাংশ) ৬৭% ৭৫% ৮২% ৮৮%
গ্রামীণ অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ (আনুমানিক শতাংশ) ২৫% ৩০% ৩৫% ৪০%

উৎস: BTRC ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরিপ এবং ICT Division এর তথ্য।

সুপারিশ

  • BTRC-কে নির্দেশ দিতে হবে যেন মোবাইল অপারেটররা গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কভারেজ ১০০% নিশ্চিত করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ডেটা প্যাকেজ ও এডটেক প্ল্যাটফর্মের জন্য জিরো-রেটিং (Zero-rating) সেবা চালু করে, যা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০৪১' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • ICT Division এবং a2i-কে সমন্বিতভাবে 'গ্রামীণ ডিজিটাল সাক্ষরতা ও এডটেক ব্যবহার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করতে হবে, যেখানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবগুলোকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বিনামূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার ও অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মের উপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে এবং স্থানীয় ভাষায় উপযোগী এডটেক কনটেন্ট তৈরিতে BASISS-এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিতে হবে।
  • BHTPA-কে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করতে হবে যাতে তারা গ্রামীণ এলাকার জন্য উদ্ভাবনী, স্বল্পমূল্যের ও অফলাইন-সক্ষম এডটেক সমাধান তৈরির জন্য স্টার্টআপগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) সহায়তা করতে পারে এবং এই সমাধানগুলোকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের সাথে একীভূত করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator