সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার অসংক্রামক ব্যাধি (Non-Communicable Diseases - NCDs) নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি নতুন পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে টেলিমেডিসিন এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭% অসংক্রামক ব্যাধিজনিত, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা রোগীদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং রোগ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বাড়াতে সক্ষম। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু জটিল প্রতিবন্ধকতা, যা সফল বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যান্সার, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোতে এই ব্যাধিগুলির কার্যকর প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা প্রায়শই অপ্রতুল। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে রোগীদের স্বাস্থ্য ডেটা (যেমন রক্তচাপ, রক্তের শর্করা) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে এবং অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক করা সম্ভব। এটি বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট। World Bank-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিতরণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ব্যবস্থাপনায় ১৫-২০% উন্নতি ঘটাতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা হ্রাস করে এবং স্বাস্থ্য ব্যয় সাশ্রয় করে। এছাড়া, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলি রোগীদের হাসপাতালে সশরীরে উপস্থিত না হয়েও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা সময় ও অর্থের সাশ্রয় ঘটায় এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমায়। বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্মার্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ার যে রূপকল্প ঘোষণা করেছে, তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই ডিজিটাল রূপান্তর অপরিহার্য।
তবে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার এই উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি কিছু গুরুতর প্রতিবন্ধকতাও বিদ্যমান। প্রথমত, ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী, বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায়, ইন্টারনেট সংযোগ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এটি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডেটা গোপনীয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তা ব্যাপক অনাস্থা তৈরি করতে পারে। এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে ডেটা সুরক্ষা আইন এবং অবকাঠামো দুর্বলতা একটি প্রধান বাধা। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও একটি বাস্তব সমস্যা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য উভয় পক্ষকেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা প্রদান করা জরুরি। এছাড়া, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মডেল নিয়েও স্পষ্ট নীতিমালার অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা এর টেকসই বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
| অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) সংক্রান্ত সূচক | ২০১৩ সালের তথ্য | ২০১৮ সালের তথ্য | লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ |
|---|---|---|---|
| ৩১-৬৯ বছর বয়সী মানুষের অকাল মৃত্যু (প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায়) | ৫৭২ | ৫১০ | ৪০০ |
| উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব (১৮+ বছর) | ২০.৪% | ২৪.৪% | ২২% |
| ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব (১৮+ বছর) | ৭.৫% | ১০.৩% | ৯% |
| WHO NCD ইন্টারভেনশন কভারেজ | ১২% | ১৯% | ৩০% |
উৎস: বাংলাদেশ NCDs প্রফাইল, WHO এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের NCD কন্ট্রোল প্রোগ্রাম।
সুপারিশ
- জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশল (National Digital Health Strategy) এর অধীনে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যা গ্রামীণ ও শহুরে উভয় অঞ্চলের রোগীদের জন্য টেলিমেডিসিন, রিমোট মনিটরিং এবং স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা নিশ্চিত করবে। এই প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)-এর যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সংযোগের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হবে এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণ উভয়ের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা হবে।
- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর অধীনে স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রবিধান তৈরি ও প্রয়োগ করতে হবে এবং ডেটা গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে, World Bank এবং ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালীকরণে বিনিয়োগ করতে হবে।