গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার শিমুলিয়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ধসে সহকারী শিক্ষিকা সারমিন ফেরদৌসী শিউলির মর্মান্তিক মৃত্যুর এক মাস পর নিহতের পরিবারের হাতে চার লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হয়েছে। গত ৫ মে বিকেলে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কে পল্লী বিদ্যুতের একটি সাবস্টেশন-সংলগ্ন সিমেন্টের খুঁটি ভেঙে পড়ার পর একে একে আরও ১৩টি খুঁটি ধসে পড়ে, যার ফলে উচ্চ-ভোল্টেজের তারের সংস্পর্শে এসে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান শিক্ষিকা শিউলি এবং আহত হন আরও দুজন। সোমবার কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে চার লাখ টাকার এই চেক হস্তান্তরকে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল কেবল একটি দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখছে, কারণ একটি প্রাণহানির মূল্য কোনো অর্থের বিনিময়ে পূরণ করা সম্ভব নয় এবং এই দুর্ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে কর্তৃপক্ষের অবহেলাজনিত একটি পরিকল্পিত বিপর্যয়।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও নির্মাণগত ত্রুটির সরাসরি ফসল। নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি খুঁটি মাটির নিচে অন্তত সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুট গভীরে স্থাপন করার কথা থাকলেও শিমুলিয়া এলাকায় খুঁটিগুলো মাত্র তিন থেকে চার ফুট গভীরে পোঁতা হয়েছিল, যা প্রকৌশলগত মানদণ্ডকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। এছাড়া জলাশয়সংলগ্ন নরম মাটিতে খুঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে যে ধরনের কংক্রিট মাফিং, অ্যাঙ্কর স্থাপন এবং পাথরকুচি দিয়ে ভিত্তি মজবুত করার কথা ছিল, তা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এর আগেও একই এলাকায় খুঁটি হেলে পড়ার ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যা স্পষ্ট করে দেয় যে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও তদারকির অভাবই এই মৃত্যুর জন্য মূলত দায়ী। আহত তন্ময় ও পূজা রানী দেবনাথের পরিবারও এই ঘটনার জন্য পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত নীতিনির্ধারক ও পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের সামনেই স্থানীয় সুধীজনরা অবকাঠামোগত নিরাপত্তার মান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক এলাকায় এখনো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ খুঁটি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত জরিপ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন পর্যায়ক্রমে মাটির নিচে স্থাপনের যে দাবি উঠেছে, তা বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রতা জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করছে। ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে দায়মুক্ত হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার এই নজিরবিহীন ব্যর্থতা কেবল একজন শিক্ষিকার জীবনই কেড়ে নেয়নি, বরং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষতিপূরণের চেক প্রদানের মাধ্যমে ঘটনার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও, ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী এখন কেবল দায়সারা অনুদান নয় বরং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি রোধে পল্লী বিদ্যুতের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করছে। যদি অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ খুঁটিগুলো অপসারণ ও মানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও কঠোর নজরদারি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।