গত কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত নীতিগত জড়তা (Policy Paralysis), কাঠামোগত সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি অনীহা এবং শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি এখন এক অভূতপূর্ব চোরাবালিতে আটকে গেছে। একদিকে দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও নব্য মেরুকরণ—এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি এখন এক চরম অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
১. অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ: দৃশ্যপট যখন খাদের কিনারায়
- মূল্যস্ফীতির ক্রনিক ট্রমা: বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং ভুল মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতি এখন কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের পকেটে নীরব ডাকাতি। "আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়, যা সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে।"
- রিজার্ভের রক্তক্ষরণ ও টাকার অবমূল্যায়ন: কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম ধরে রাখার ভুল নীতি এবং হুন্ডির আগ্রাসনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পুষ্টিহীনতা চরম রূপ নিয়েছে। "রিজার্ভে কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট এবং রেমিট্যান্সের অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ এখনও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।"
- ব্যাংকিং খাতের আইসিইউ দশা: বছরের পর বছর ধরে চলা 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা তোষামোদের অর্থনীতি ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের পাহাড়ে পরিণত করেছে, যা আর্থিক খাতকে তারল্য সংকটের আইসিইউতে পাঠিয়েছে।"ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলে আইএমএফ সতর্ক করেছে।"
- রাজস্বের কঙ্কালসার রূপ: জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার বৈশ্বিক মানদণ্ডে তলানিতে থাকায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার এখন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। "২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৯ শতাংশে নেমে আসে, যা উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত নিম্ন এবং রাজস্ব সক্ষমতার কাঠামোগত দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।"
২. রাজনৈতিক হাওয়া বদল: সুযোগ নাকি নতুন অনিশ্চয়তা?
- বিনিয়োগকারীদের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ মোড: ক্ষমতার অলিন্দে হাওয়া বদলালেও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা কাটেনি, যার ফলে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিরা নতুন বিনিয়োগে সাইরেন বাজাচ্ছেন।
- শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার সাইক্লোন: রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তনের সুযোগে পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার যে শিথিলতা দেখা গেছে, তা রপ্তানি বাণিজ্যের মেরুদণ্ডকে দুর্বল করছে।
- দাতাগোষ্ঠীর কঠোর প্রেসক্রিপশন: আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক ঋণদাতারা এখন আর মিষ্টি কথায় ভুলছে না; তারা বাজেট সহায়তার বিপরীতে কঠোর সংস্কারের ‘তিক্ত বড়ি’ গিলতে বাধ্য করছে।
৩. সংস্কারের থেরাপি: ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি বাঁচানোর মহৌষধ
[অর্থনৈতিক মেকওভারের ৪টি পিলার]
. ফিসকাল সার্জারি এনবিআরের আমূল আধুনিকায়ন ও করের জাল বিস্তার
. ফাইন্যান্সিয়াল ক্লিনআপ ব্যাংকিং খাতের মাফিয়াতন্ত্র উপড়ে ফেলা ও আইনি কঠোরতা
. মার্কেট সিন্ডিকেট মেকওভার মধ্যস্বত্বভোগীদের চেইন ভেঙে সরবরাহ সোজাসুজি করা
. পলিসি প্রেডিক্টিবিলিটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঐকমত্য এবং
"আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর মতে, রাজস্ব, আর্থিক খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।"
৪. অন্ধকারের ওপারে আলো: রূপান্তরের ডাক
বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি বছরের পর বছর ধরে নেয়া ভুল সিদ্ধান্তের এক সম্মিলিত বিষফল। রাজনৈতিক হাওয়া বদলকে কেবল ক্ষমতার হাতবদল হিসেবে না দেখে, একে যদি প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি অভিযানের (Institutional Cleansing) হাতিয়ার করা না যায়, তবে সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিকে বাঁচানো অসম্ভব। বাংলাদেশ এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে হয় তাকে সাহসী সংস্কারের পথে হেঁটে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, অথবা নীতিগত ব্যর্থতার চোরাবালিতে আরও গভীরে তলিয়ে যেতে হবে।
তথ্যসূত্র:
১. International Monetary Fund (IMF) Article IV Consultation on Bangladesh 2026
২. IMF Staff Report on Bangladesh Economy 2026
৩. IMF Review of Bangladesh ECF/EFF/RSF Programme 2025