সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আধশোয়া এক শরীর। চোখ দুটোতে যেন হাজার যুগের ক্লান্তি আর এক অদ্ভুত শূন্যতা। ডান পা-টি অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় একটু উঁচুতে তোলা, আর সেই পায়ের বুড়ো আঙুলে জড়ানো একটি মোটা দড়ি। এই দড়ির অন্য প্রান্তটি চলে গেছে দেয়াল ফুঁড়ে ভেতরের এক বিলাসবহুল শয়নকক্ষে। সেখানে তখন কোনো শ্বেতাঙ্গ 'সাহেব' বা 'মেমসাহেব' হয়তো গভীর ঘুমে মগ্ন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
বাইরে যখন গ্রীষ্মের চড়া রোদ কিংবা গুমোট অন্ধকার রাত, তখন এই মানুষটির পায়ের পাতা অনবরত নড়ে চলেছে দুলকি চালে। এটি কোনো ব্যায়াম নয়, কোনো শরীরচর্চাও নয়; এটি ঔপনিবেশিক ভারতের সবচেয়ে নির্মম এবং বৈষম্যমূলক এক পেশার জীবন্ত দলিল—'পাঙ্খা পুলার' বা পাখাওয়ালা।
যান্ত্রিক সভ্যতার আগের দাসত্ব
বিদ্যুৎচালিত সিলিং ফ্যান কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্ম হওয়ার অনেক আগের কথা। ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় তীব্র দাবদাহ সহ্য করা ব্রিটিশ শাসকদের জন্য ছিল এক দুঃসহ পরীক্ষা। সেই উত্তাপ থেকে বাঁচতে তারা বেছে নিয়েছিল এক অদ্ভুত যান্ত্রিক দাসত্ব। ঘরের সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো কাপড় বা কাঠের তৈরি ভারী ফ্রেমের এক বিশাল পাখা। আর সেই পাখাকে সচল রাখতে প্রয়োজন হতো সস্তা ও বাধ্য শ্রমিকের—যাদের বলা হতো 'পাঙ্খা পুলার'।
অধিকাংশ সময় হাত দিয়ে পাখা টানতে টানতে হাত অবশ হয়ে আসত। তাই পিঠ ঠেকিয়ে বসে কিংবা শুয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে দড়ি বেঁধে নেওয়াই ছিল তাদের একটানা কাজ করার মরিয়া কৌশল।
বিনিদ্র রাত আর পিঁপড়ের কামড়
এই পেশার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার গল্প। সাহেবদের নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের গ্যারান্টি দিতে এই পাখাওয়ালাদের রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে জেগে থাকতে হতো। মাঝরাতে অনবরত দড়ি টানতে টানতে ক্লান্ত শরীরে কোনো ভৃত্যের চোখের পাতা যদি এক মুহূর্তের জন্য এক হয়ে যেত, তবে ঘরের ভেতরের বাতাস থমকে যেত। আর বাতাস থামার সাথে সাথেই শ্বেতাঙ্গ প্রভুর ঘুম ভেঙে যেত।
এর শাস্তি ছিল অবর্ণনীয়। ঘুমিয়ে পড়ার অপরাধে জুটত বুটের লাথি কিংবা চাবুকের নির্মম আঘাত। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, অনেক ব্রিটিশ মালিক তাদের ভৃত্যদের বসার বা শোয়ার জায়গায় চিনি বা মিষ্টি সিরাপ ঢেলে রাখত, যাতে পিঁপড়ের কামড়ের যন্ত্রণায় তারা রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে না পারে। এক শ্রেণির মানুষের নির্বিঘ্ন ঘুমের জন্য অন্য এক শ্রেণির মানুষের পুরো রাতকে এভাবেই নরক বানিয়ে দেওয়া হতো।
ইতিহাসের ধুলোয় হারানো দীর্ঘশ্বাস
পাখাওয়ালারা মূলত সমাজ ও জাতপ্রথার একদম নিচের সারির দরিদ্র মানুষ ছিলেন। এমনকি ১৮৭০ সালের দিকে কলকাতার কিছু বাবুরা এই কাজে অন্ধদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন, যাতে তাদের কর্মসংস্থান হয়। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন রেল স্টেশন, আদালত ও সরকারি অফিসগুলোতে বিদ্যুৎচালিত ফ্যানের আগমন ঘটতে শুরু করে, তখন এই পাখাওয়ালাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসে।
একসময় হঠাৎ করেই তারা ইতিহাসের পাতা থেকে বিলীন হয়ে যান। প্রযুক্তি হয়তো মানবজাতিকে আরাম দিয়েছে, কিন্তু এই আদিম আলোকচিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজ আমরা যে যান্ত্রিক বাতাসের নিচে পরম শান্তিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার ঠিক এক শতাব্দী আগেই এই ভূখণ্ডেরই কোনো এক পূর্বপুরুষের পায়ের আঙুলে বাঁধা ছিল পরাধীনতার এক নির্মম ও ঘর্মাক্ত দড়ি।
লেখক ও কলামিস্ট
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।