মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়ার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল স্কুলে ভর্তির অনেক আগেই। কিন্তু তাঁর ছররা মার্কা ছড়ার সঙ্গে পরিচয় হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে। পণ্ডিত স্যার একদিন ভাবসম্প্রসারণের জন্য বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তি—
"কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে,
ভাই ব’লে ডাক যদি দেব গলা টিপে।
হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা,
কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা।..."
পণ্ডিত স্যারের সেই ক্লাসের পর বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখন পুরোদস্তুর মফস্বল সাংবাদিক। হাতে ক্যামেরা, পকেটে ডায়েরি। কিন্তু প্রতিদিন সরকারি অফিসে তথ্য খুঁজতে গিয়ে রবিঠাকুরের সেই ‘ছররা’ ছড়ার মর্মার্থ হাড়ে হাড়ে টের পাই।
সেদিন গরম খবর সংগ্রহ করতে গেছি জেলার সিভিল সার্জন সাহেবের দপ্তরে। রুমে ঢুকেই স্বভাবসুলভ সৌজন্যে বললাম, "আসসালামু আলাইকুম সিভিল সার্জন ভাই, ডেঙ্গুর নতুন আপডেটটা..."
‘ভাই’ শব্দটা মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই সিভিল সার্জন সাহেবের এসি রুমের তাপমাত্রা এক ঝটকায় মাইনাস ডিগ্রিতে নেমে গেল! ফাইলের ওপর থেকে কলমটা এমনভাবে থামল, যেন আমি ডেঙ্গুর রিপোর্টের বদলে ওনার জমি লিখে দিতে বলেছি। চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন রবিঠাকুরের সেই কেরোসিন শিখা স্বয়ং চেয়ারে বসে বলছেন—‘ভাই ব’লে ডাক যদি, দেব গলা টিপে!’
তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "আইন জানেন? সরকারি কর্মকর্তাকে কী ডাকতে হয় স্কুলে শেখায়নি? ভাই কেন? আমি কি আপনার আপন ভাই? নাকি খালাতো ভাই?"
আমি আমতা আমতা করে বললাম, "না মানে ভাই, সংবিধানে তো বলা আছে আপনারা জনগণের সেবক। সেই হিসেবে..."
"রাখেন আপনার সংবিধান!" সিভিল সার্জন সাহেব ফুঁসে উঠলেন, "এখানে আমি সিভিল সার্জন। প্রটোকল মেইনটেইন করুন।" ওনার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, ওনার চেয়ারের নিচে কেরোসিনের এক বিশাল অদৃশ্য ড্রাম আছে, যা ওনাকে অহংকারের আলোয় উদ্ভাসিত করে রেখেছে। আর আমার মতো মামুলি মাটির প্রদীপ সাংবাদিককে তুড়ি মেরে নিভিয়ে দিতে পারেন।
আমি যখন ওনার ‘কেরোসিনীয়’ তাপে ভস্মীভূত হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই ওনার টেবিলের ওপর রাখা লাল টেলিফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সিভিল সার্জন সাহেবের চেহারার সব কেরোসিন যেন মুহূর্তে কর্পূর হয়ে উড়ে গেল। ওনার মেরুদণ্ড চেয়ারের সাথে বাঁকা হয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণ তৈরি করল। মুখে তেইশ ক্যারেটের খাঁটি হাসি ফুটিয়ে রিসিভারটা কানে নিলেন। ওপাশে আর কেউ নন—সাক্ষাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়! গগনেতে উদিত হয়েছেন আসল ‘চাঁদা’।
ফোনে সচিবের গলা শোনা মাত্রই আমাদের সিভিল সার্জন সাহেব গদগদ হয়ে বলতে লাগলেন, "জি স্যার... জি স্যার... অবশ্যই স্যার! আপনি যা বলবেন তাই হবে স্যার। আপনি আমাদের অভিভাবক, বড় ভাইয়ের মতো, মানে এক্কেবারে আপন দাদা, স্যার! আপনার নির্দেশ শিরোধার্য।"
টেলিফোনের ওপাশে সচিব মহোদয় ওনাকে বকা দিচ্ছেন নাকি প্রশংসা করছেন জানি না, কিন্তু এপাশে সিভিল সার্জন সাহেবের কুর্নিশ দেখে মনে হচ্ছিল ছড়ার সেই লাইনটা লাইভ অ্যাকশনে মঞ্চস্থ হচ্ছে—‘কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা!’
মিনিট পাঁচেক ‘জি স্যার’, ‘ইয়েস স্যার’ আর ‘দাদা স্যার’ জপার পর ফোনটা যখন নামিয়ে রাখলেন, তখন ওনার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।
আমি আর দেরি না করে সোজা ওনার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মুখে একটা মৃদু কিন্তু মারাত্মক ব্যঙ্গাত্মক হাসি ঝুলিয়ে বললাম, "তাহলে সিভিল সার্জন... থুড়ি, কেরোসিন সাহেব! ওপরের চাঁদা উঠলে আপনারা ‘দাদা’ হন, আর আমাদের মতো মাটির প্রদীপের সামনে ‘গলা টিপে’ ধরতে আসেন? ছড়াটা কিন্তু ১০০ ভাগ ফলে গেল!"
সিভিল সার্জন সাহেব এবার আর রেগে গেলেন না। লজ্জায় ওনার ফর্সা মুখটা মাটির প্রদীপের মৃদু তেলের আলোর মতোই লাল হয়ে গেল। ওনাক টেবিল থেকে ডেঙ্গুর ফাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "এই নিন ভাই, আপনার রিপোর্ট।
আমি ফাইলটা নিয়ে মনে মনে হাসতে হাসতে বের হয়ে এলাম। ভাবলাম, ষষ্ঠ শ্রেণির পণ্ডিত স্যার যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে দেখতেন ওনার ছাত্র আজ মাঠপর্যায়ে এসে কীভাবে আমলাতন্ত্রের ‘কেরোসিন মার্কা’ ভাবসম্প্রসারণের বাস্তব রূপ দেখে বেড়াচ্ছে!
রম্যলেখক , কেরানীগঞ্জ , ঢাকা
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।