close

ভিডিও দেখুন, পয়েন্ট জিতুন!

কেন বারবার আক্রমণের শিকার ভিপি নুর?

Abdullah Al Mamun avatar   
Abdullah Al Mamun
ভিপি নুর যখন রক্তে ভিজে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবেন, তখন তিনি হয়তো আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হবেন।..

অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত, রক্তে রঞ্জিত শরীরটাকে যখন সহযোদ্ধারা কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আরেকবার দেখল তাদের প্রিয় নেতা ভিপি নুরুল হক নুরকে। আজ, ২৯শে আগস্ট, ২০২৫, ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদের এক কর্মসূচিতে তিনি আবারও হামলার শিকার হলেন। তার মাথা ফেটে গেছে, সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। এই একটি ঘটনা, যা হয়তো কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতার জীবনের শেষ অধ্যায় হতে পারতো, কিন্তু নুরের ক্ষেত্রে এটি তার বীরত্বের উপাখ্যানের আরও একটি নতুন অধ্যায়। এটি কেবল একটি হামলা নয়, এটি দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকারের জন্য তার দীর্ঘ লড়াইয়ের এক নতুন রক্তাক্ত দলিল।

এই প্রতিবেদনটি শুধু আজকের হামলার বিবরণ নয়, এটি একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, একজন নির্ভীক যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠা নুরুল হক নুরের জীবন ও সংগ্রামের একটি বিস্তৃত চিত্র। যে মানুষটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন, ন্যায়ের পক্ষে আপসহীনভাবে কথা বলেন, এবং ভয়হীনভাবে জনগণের পাশে দাঁড়ান, তার ওপর কেন বারবার হামলা হয়, কেন তাকে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়—এই প্রতিবেদন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবে

আজকের হামলাটি ছিল অপ্রত্যাশিত। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা যখন জড়ো হয়েছিলেন, তখন জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জে নুর গুরুতর আহত হন। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানসহ আরও অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী এই হামলায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই হামলার পর গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয় যে, নুরের দলের লোকজন তাদের পার্টি অফিসে হামলা করলে তারা প্রতিরোধ করেন। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি এই অভিযোগের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নুরুল হক নুর এখনও একটি স্পর্শকাতর নাম, যাকে দমন করতে মরিয়া একদল শক্তি।

নুরুল হক নুরের উত্থান কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা অনুসরণ করে হয়নি। তিনি কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন বা কোনো ক্ষমতাধর দলের ছত্রছায়ায় তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়নি। বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই তরুণ, সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন। তার এই উত্থানের মূল ভিত্তি ছিল ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অধিকারের দাবিতে তিনি যখন রাজপথে নেমেছিলেন, তখন তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাদের কণ্ঠস্বর। তার অদম্য সাহস, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে দ্রুতই জনগণের মাঝে পরিচিতি এনে দেয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমন করতে যখন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও সহযোগী সংগঠনগুলো নির্মম নির্যাতন শুরু করে, তখনো নুর পিছু হটেননি। বরং সেই নিপীড়ন তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই আন্দোলনের সফলতার পর তিনি ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অংশ নেন। এটি ছিল একটি অসম্ভব লড়াই, কারণ তার প্রতিপক্ষ ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন। কিন্তু ছাত্র সমাজের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ সমর্থন তাকে ডাকসুর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে সাহায্য করে। তিনি বিপুল ভোটে সহসভাপতি (ভিপি) পদে জয়ী হন, যা ছিল এক প্রকার অলৌকিক বিজয়।

নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে হামলা, নির্যাতন এবং রক্তপাতের ইতিহাস। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি অন্তত ২০ বারের বেশি হামলার শিকার হয়েছেন। প্রতিটি হামলার ক্ষত তার গায়ে, কিন্তু তার মনোবল ভাঙতে পারেনি কোনো শক্তি। এই হামলাগুলো কেবল শারীরিক আক্রমণ ছিল না, এগুলো ছিল তার কণ্ঠরোধ করার এবং তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা।

৩০শে জুন, ২০১৮: এটি ছিল তার ওপর প্রথম নথিভুক্ত হামলা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক থাকাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে তাকে মারধর করা হয়। অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এই হামলার কোনো বিচার না হওয়ায় হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

২০১৯ সালের মার্চ মাস: ডাকসু নির্বাচনের দিন (১১ই মার্চ) রোকেয়া হলে ভোট কারচুপির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন এবং আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর নির্বাচনে ভিপি পদে জয়ী হওয়ার পরদিন, ১২ই মার্চ, ক্যাম্পাসে প্রবেশকালে আবারও তার ওপর হামলা হয়।

২০১৯ সালের এপ্রিল ও মে মাস: এই সময়কালে তিনি আরও একাধিক হামলার শিকার হন। ২রা এপ্রিল, এক ছাত্রকে মারধরের প্রতিবাদে তিনি এসএম হলে গেলে ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত হন। এর পর ২৫শে ও ২৬শে মে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বগুড়ায় ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে গেলে যথাক্রমে ছাত্রলীগ কর্মীদের বাধা ও হামলার শিকার হন। বগুড়ার হামলায় তিনিসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন।

১৪ই আগস্ট, ২০১৯: ঈদের ছুটিতে নিজ এলাকা পটুয়াখালীর গলাচিপায় গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। তিনি অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা এই হামলা চালিয়েছে। হামলায় তিনি ও তার ৩০-৪০ জন সহযোগী আহত হন। তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয় এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৯: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক বিক্ষোভে তিনি আবার হামলার শিকার হন, যেখানে তার হাতের দুটি আঙুল ভেঙে যায়।

২২শে ডিসেম্বর, ২০১৯: ডাকসু ভবনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ এবং ছাত্রলীগের কর্মীদের সমন্বিত হামলায় তিনিসহ অন্তত ১৫-৩০ জন আহত হন। এই হামলা ছিল অত্যন্ত বর্বর ও অমানবিক। হামলাকারীরা তার অনেক সহযোদ্ধাকে নির্মমভাবে মারধর করে, যার মধ্যে কয়েকজনকে আইসিইউতে পর্যন্ত নিতে হয়েছিল। নুর নিজেই রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। এই হামলার পর দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হামলাকারীরা কোনো শাস্তি পায়নি।

হামলার পাশাপাশি, নুরুল হক নুরকে বারবার রাজনৈতিক হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দলগুলো শারীরিক হামলা ছাড়াও আইনি প্রক্রিয়াকে তার কণ্ঠরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

২০১৯ সালের ২২শে ডিসেম্বরের ডাকসু ভবনের হামলার ঘটনায় পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে। একই সাথে নুরও পাল্টা আরেকটি মামলা করেন। কিন্তু পুলিশ উভয় মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়। পুলিশ দাবি করে, ভুক্তভোগীরা চিকিৎসার সনদ দেননি এবং তদন্তে সহযোগিতা করেননি। নুর এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা ভিডিও ফুটেজ জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার সনদ দেয়নি। এই ঘটনাটি বিচারিক দায়মুক্তির এক নির্লজ্জ উদাহরণ, যা রাজনৈতিক সহিংসতাকে আরও উসকে দেয়।

সর্বশেষ, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, যখন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলছিল, তখন তাকে সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অথচ তিনি এই আন্দোলনে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। তার স্ত্রী মারিয়া আক্তার অভিযোগ করেন, রিমান্ডে তাকে বর্বরভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, যার ফলে তিনি তিন থেকে চারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেফতার ও নির্যাতন প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নযন্ত্র কীভাবে একজন জনপ্রিয় নেতাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে।

ভিপি নুরুল হক নুর কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ভয়হীনতা, সততা এবং প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি কেবল ছাত্র সমাজের কথাই বলেননি, তিনি দেশের কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের দাবিতেও কথা বলেছেন, নুসরাত ও আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন। তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে কথা বলেছেন। তার আপসহীন মনোভাব এবং নির্ভীক নেতৃত্ব তাকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ভালোবাসা এনে দিয়েছে।

তিনি বলেন, "ছাত্রজনতা তরুণদের বিশ্বাস করেই বাংলাদেশকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে।" তার এই কথাগুলো কেবল মুখের বুলি নয়, তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এর প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি কখনোই নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আপস করেননি, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তার এই অদম্য স্পৃহা তরুণদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে, যারা তার ওপর প্রতিটি হামলার পর আরও দৃঢ়ভাবে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভিপি নুরুল হক নুরের জীবন একটি জীবন্ত উদাহরণ যে, কীভাবে একজন মানুষ শত নির্যাতন, শত বাধা ও শত আঘাতের মুখেও তার আদর্শে অটল থাকতে পারে। তার ওপর প্রতিটি হামলা, প্রতিটি মামলা এবং প্রতিটি নির্যাতন তার রাজনৈতিক জীবনের গতিপথকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি একজন নির্যাতিত ছাত্রনেতা থেকে দেশের অন্যতম তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি গণঅধিকার পরিষদ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, যা তরুণদের জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। তার এই উত্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা এবং সমর্থনকে কোনো শক্তি দমন করতে পারে না।

ভিপি নুর যখন রক্তে ভিজে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবেন, তখন তিনি হয়তো আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হবেন। তার ওপর আজকের হামলাটি কেবল তার রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায় যোগ করল, কিন্তু একই সাথে এটি প্রমাণ করে যে, তার আদর্শ এখনও জীবিত এবং তার সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। তিনি তার কথায়, “আমি লড়বো, কারণ বাংলার মানুষ লড়াই চায়”। এই একটি বাক্যেই তার জীবন দর্শন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম জানে, তাদের একজন নেতা আছেন, যিনি তাদের জন্য সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। তার লড়াই বাংলাদেশের জনগণের, তার বিজয় বাংলাদেশের মানুষের।

Walang nakitang komento