নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্যোগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়েছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি”, যা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের অপরিহার্যতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। দিনব্যাপী আয়োজিত এই সেমিনার ও আলোচনা সভায় স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক এবং সচেতন পাঠকদের অংশগ্রহণে গ্রন্থাগার আন্দোলনের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। মূলত পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের পাশাপাশি বইমুখী করার লক্ষ্যেই এই আয়োজনের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে গ্রন্থাগারকে কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, বরং একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
আলোচনা সভায় বক্তারা গ্রন্থাগার ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি এবং পাঠকদের ভোগান্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আটপাড়া উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ান মো. আবুল হাসেম খানসহ অন্যান্য বক্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে গ্রন্থাগারগুলোতে পর্যাপ্ত আধুনিক বইয়ের অভাব, প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা পাঠকদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিয়মিত বাজেট বরাদ্দের অভাবে গ্রামীণ পর্যায়ের এই লাইব্রেরিগুলো তার কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভুক্তভোগী পাঠকদের অভিযোগ, লাইব্রেরিতে সমসাময়িক বিশ্বমানের বই এবং গবেষণামূলক তথ্যের সহজলভ্যতা না থাকায় তারা সৃজনশীল চর্চায় পিছিয়ে পড়ছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত মানোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রতিকূলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেমিনারে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, সরকারি অনুদান বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রন্থাগারগুলোতে ই-রিসোর্স ও ডিজিটাল লাইব্রেরি সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় পর্যায়ের এই গ্রন্থাগারগুলোকে আধুনিকীকরণ করতে শিশু-কিশোর কর্নার স্থাপন, নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজন এবং বইমেলার মতো কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লাইব্রেরিয়ানদের পেশাগত মানোন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রন্থাগারের উন্নয়নে সহায়তার আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে যাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পরিশেষে, জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ২০২৬-এর এই আয়োজন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অগ্রযাত্রায় গ্রন্থাগারের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণের সুযোগ করে দিয়েছে। গ্রন্থাগারগুলো যদি সক্রিয় এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন হয়ে ওঠে, তবেই তা আগামীর শিক্ষিত ও জ্ঞানভিত্তিক প্রজন্ম তৈরিতে সক্ষম হবে। আটপাড়ার মতো উপজেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগারগুলোর আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা গেলে তা জাতীয় পর্যায়ে মেধা বিকাশে বিশাল প্রভাব ফেলবে। একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে বইয়ের বিকল্প নেই, আর সেই বইকে সাধারণের নাগালে পৌঁছে দিতে গ্রন্থাগারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা।