বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক লোগো পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত পুরোনো লোগোর জায়গায় নতুন এক নকশা সামনে এসেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
আজ রোববার ঢাকার বসুন্ধরায় জামায়াতের আমিরের কার্যালয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এই নতুন লোগোটি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে। এখান থেকেই পরিষ্কার হয়েছে, জামায়াত পুরোনো লোগোর পরিবর্তে নতুন নকশার দিকে এগোচ্ছে।
আগের লোগোতে সবুজ গম্বুজের ভেতরে লাল হরফে আরবিতে লেখা ছিল ‘আল্লাহু’। তার ওপরে ছিল সবুজ রঙের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এবং নিচে সাদা অক্ষরে পবিত্র কোরআনের আয়াত ‘আকিমুদ্দিন’ (দ্বীন কায়েম করো) লেখা ছিল। এই ঐতিহ্যবাহী নকশা বহু বছর ধরে জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
কিন্তু আজকের বৈঠকে প্রকাশিত নতুন লোগোতে এই চিত্র একেবারেই বদলে গেছে। সেখানে আর দেখা যাচ্ছে না পুরোনো আরবি লেখাগুলো। নতুন লোগোতে রয়েছে সবুজ রঙের একটি গ্রন্থের ওপর উদীয়মান সূর্য, যা নতুন সূচনা ও জাগরণের প্রতীক হিসেবে ধরা হচ্ছে। সূর্যের ঠিক ওপরে রয়েছে একটি কলম, যা আবার দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লার দণ্ড হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রন্থের দুই প্রান্ত থেকে তৈরি হয়েছে একটি অর্ধবৃত্তাকার কাঠামো, যা প্রবেশদ্বার বা উন্মুক্ত পথের প্রতীক হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর নিচে সোনালি অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’। এছাড়া সোনালি পটভূমির ওপর সাদা অক্ষরে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় দলের নামও সংযোজন করা হয়েছে।
লোগো পরিবর্তন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, “নতুন আঙ্গিকে এই লোগো করা হয়েছে। জামায়াত আমিরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বৈঠকে আজ এটি প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে এটি এখনও প্রস্তাবিত, চূড়ান্ত নয়। আরও কয়েকটি নকশা তালিকায় আছে। যাচাই–বাছাই শেষে আগামী মাসে নতুন লোগো চূড়ান্ত করা হতে পারে, সেক্ষেত্রে এটিও বাদ পড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, অনেকেই ধারণা করছেন যে নতুন লোগো থেকে ‘আল্লাহু’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, “লোগোর ভেতরে থাকা কলমের ভেতরে ‘আল্লাহু’ লেখা আছে।
শুধু লোগো নয়, দলীয় পতাকাও পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তাঁর ভাষায়, “অনেক দিন ধরে একই লোগো ও পতাকা ব্যবহার করা হচ্ছে। আগের লোগো তৈরি হওয়ার সময় নান্দনিক ডিজাইনের তেমন সুযোগ ছিল না। এখন নতুন প্রেক্ষাপটে এগুলো পরিবর্তনের জন্য দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়েছে। আমরা এটিকে নতুন শেপ বা কাঠামো দিতে চাই। সেই চিন্তা থেকেই এই পরিবর্তনের উদ্যোগ।
জামায়াতের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে দলের নতুন কৌশলের ইঙ্গিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত হয়ে থাকা ইসলামপন্থী এই দলটি নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের পুনঃপরিচিত করার উদ্দেশ্যে সাংগঠনিক ও প্রতীকি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। দলীয় আদর্শে নতুনত্ব না আনলেও প্রতীকের পরিবর্তন দলের ভবিষ্যৎ কৌশলের অংশ হতে পারে।
পুরোনো প্রতীকের সঙ্গে এক যুগের বেশি সময় ধরে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী এবার নতুন চেহারায় নিজেদের উপস্থাপনের চিন্তা করছে – এটি নিঃসন্দেহে দলের ইতিহাসে একটি বড় মোড় হতে যাচ্ছে। আগামী মাসে যদি এই নতুন নকশা চূড়ান্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে জামায়াতের পরিচয়ে আসতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।