close

ভিডিও আপলোড করুন পয়েন্ট জিতুন!

বেতাগীতে জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে ধুকছে জনপদ

SepahiTv. News avatar   
SepahiTv. News
জলবায়ু পরিবর্তনে বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় বরগুনা জেলার বেতাগী  উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। উপকূলীয় মানুষদের প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হচ্ছে।..



হোসাইন সিপাহী, বেতাগী, বরগুনাঃ
জলবায়ূ পরিবর্তনে/বিপর্যয়ে ধুকছে বেতাগী 
“ভাইরে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই। কোনোদিন মাছ পাই কোনা দিন পাই না।  নদীর কুলে বাড়ি ছিল । বাপ দাদায় উঠাইছিল। কিন্তু হঠাৎ ঘুমের মধ্যে খালি খালি বাতাস আর বাতাস। চালে ডটন উড়াইয়া লইয়া গেল, মাইয়া পোলারে লইয়া কোনো রকম বের হইয়া পাশের বাড়িতে যাইতে পারি। কিন্তু এদিকে ঘর বাড়ি সব বাতাসে উড়াইয়া লইয়া গেল। ভাইরে ঘর লইয়া ঘেছে তাতেও দুঃখ আল্লে না নদীর তুফানে জোয়াল বাইন্দা একেরপর এক ঘর নদীতে মিল্লা গেল । হেরপর আর জমিতে ঘর উঠাইতে পারলাম না। নদীর পারে ঝুপরি ঘর বানাইয়া মাইয়া পোলারে লইয়া বাইছা আছি। ভাইরে মোগো আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই। এই ঝুপরি ঘরও প্রতি বছর বানান লাগে। বেশি বাতাস হইলেই ভাইঙ্গা পড়ে। ” এভাবেই অশ্রুসিক্ত হয়ে সিডরে হারানো শেষ সম্বল হারানোর ঘটনা বর্ণনা করেন বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগী উপজেলার আঃ হালিম। 

এমন হালিমের মতোন এই উপজেলার শত শত হালিম রয়েছে যাা প্রতি বছর প্রাকৃতিক দূর্যোগে নিজেদের শেষ সম্বল হারিয়ে আাজ সরকারের আবাসনের ঘরে বসত করছেন। 
সর্বশেষ ঘূণিঝর রেমালে ঘর হারা সরিষামুড়ি ইউনিয়নের মধু গাজী আমাদের বলেন, তিনি অন্যের বাড়িতে কামলা  (দৈনিক মজুরিতে কাজ) দিয়ে সেই টাকা দিয়ে থাকার জন্য ঘর তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত পানি ও বাতাসে তার ঘর উড়িয়ে নিয়ে  যায় । সেই থেকে আর ঘরে থাকা হয়নি তার। এমন দুর্ভিসহ জীবনযাপন বহু মানুষের কপালে রয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় বরগুনা জেলার বেতাগী  উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। উপকূলীয় মানুষদের প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হচ্ছে। জলবায়ু হচ্ছে কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়া। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে গ্রিণহাউস প্রভাব বলা হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন-অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকষ্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। যার ফলশ্রুতিতে জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণে প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষি ক্ষেত্রে ও নদী ভাঙন। বেঁচে থাকার জন্য উপকূলীয় মানুষকে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা বা হুমকি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে। গত ১৬ বছরে উপকূলীয় উল্লেখযোগ্য ঘূর্ণিঝড়-২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৮ সালে ৩ মে নার্গিস, ২০০৯ সালে ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালে ১৬ মে মহাসেন, ২০১৬ সালে ২১ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালে ৩০ মে মোরা, ২০১৮ সালে ১১ অক্টোবর তিতলি, ২০১৯ সালে ৩ মে ফণী, ২০১৯ সালে ৯ নভেম্বর বুলবুল, ২০২০ সালে ২০ মে আম্ফান , ২০২২ সালে ২৫ অক্টোবরে সিত্রাং, ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বরের মোখা, ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর হামুন, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর মিধিলি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৬ মে রেমাল  আঘাত আনে।


এ বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলীয় মানুষের জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি করেছে। এসময় সমুদ্রের লোনাপানি বিভিন্ন বেড়ি বাঁধ ভেঙে লোকালয়সহ ফসলের মাঠে প্রবেশ করছে। আর এ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় লাখ লাখ মানুষের বসবাসে দুর্বীষ হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোনাপানির আধিক্য। আর নষ্ট হয়েছে সুপেয় পানি। উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগী উপজেলায় প্রতিনিয়ত নদ-নদীর বাঁধ ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল (বঙ্গোপসারের মুখোমুখি) দেশের অন্যতম দুর্যোগ প্রবণ এলাকা। জলবায়ু প্রভাবের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এ এলাকার বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠী বা মানুষের গ্রাম থেকে শহরে আগমন, স্থান বদল, কয়েকদিন কিংবা বহু বছর নিজের আদি বা স্থায়ী বাড়ি থেকে অনুপস্থিতি, সাময়িক অভিবাসন বা স্থায়ী আবাস পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটছে।
বরগুনার বেতাগী উপজেলা বিষখালী নদীর তীরে অবস্থান করলেও এর দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে রয়েছে পায়রা নদী। চারপাশ ঘীরে নদী খালময়। উপজেলার বেশিরভাগই বন্যা,অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
তবে এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিটি ইউনিয়নে গঠন করেছে ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি (UDMC), যা একটি আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করার কথা। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দেশের অধিকাংশ ইউনিয়নে এসব কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তারা নিষ্ক্রিয়, অকার্যকর বা বহু বছর ধরে সভা করে না, এমনকি সদস্যরা নিজেও জানে না যে তারা এই কমিটিতে আছে কি না!

 

ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মূলত ভূমিকা এবং দায়িত্ব হল- স্থানীয় দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও ঝুঁকি চিহ্নিত করা। জনগণের মধ্যে ঝুঁকি মোকাবেলা বিষয়ক সচেতনতা তৈরি করা। বার্ষিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Annual Action Plan) প্রণয়ন; বার্ষিক বাজেট প্রস্তাবনায় ১০% তাদের কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্তি; দুর্যোগের সময়, পূর্বে ও পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয় করা; বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় কাজ করা।

 

তবে এ কমিটি নিষ্ক্রিয়তার কারণ হল- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের অভাব; রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি; প্রশিক্ষণ ও বাজেটের অভাব; নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির অভাব; বার্ষিক পরিকল্পনা থাকলেও তা ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটে প্রতিফলিত হয় না।

 

এরমধ্যে আবার লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকির অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। দুর্যোগকালে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্ক ব্যক্তিরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ খুবই সীমিত। UDMC-এর পুনর্গঠনের সময় এই লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকির অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকি এড়াতে সমতা ও সহনশীলতা নিশ্চিতের কিছু কৌশল রয়েছে।

 

তবে নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার ও সন্তানদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা উপেক্ষা করেন। দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা ও যৌন হয়রানির ঝুঁকি থাকে, যা নারী ও কিশোরীদের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় অনুপস্থিত থাকে, ফলে তাদের চাহিদা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয় না।

 

এদিকে জাতীয় নীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-এর মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP)-এ নারী-সংবেদনশীল অভিযোজন কার্যক্রমের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

 

UDMC-এ নারীর অন্তর্ভুক্তি আসলে কেন গুরুত্বপূর্ণ? স্থানীয় নারী প্রতিনিধি, নারী সিএসও সদস্য ও কমিউনিটি নারী নেতাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করলে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদা পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়। নারী সদস্যরা জল, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আশ্রয় ও খাদ্য ব্যবস্থা বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনীয় তথ্য আনতে পারেন, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও মানবিক করে তোলে। নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ দুর্যোগ পূর্ব প্রস্তুতি, সাড়া প্রদান ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক করে। তাই টউগঈ গঠন ও পুনর্গঠনের সময় কমপক্ষে ৩০% নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। নারীদের জন্য আলাদা ক্ষমতায়নমূলক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ। নারী নেতৃত্বকে সমর্থন করতে স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা ও মনোভাব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া। দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নারী শুধু উপকারভোগী নয়, সক্রিয় অংশীদার। তাই লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকির অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু সমতা নয়, বরং দুর্যোগ সহনশীল সমাজ গঠনের একটি অনিবার্য উপাদান।

 

যদি সঠিকভাবে বার্ষিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, তাহলে সেটি ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার (ADP) অংশ হওয়া উচিত। এর ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও অভিযোজনের রূপ নেবে।

 

বার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেট সংযুক্তি: টেকসই ও কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি; ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির (UDMC) অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো দুর্যোগ ঝুঁকি চিহ্নিত করে একটি বার্ষিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Annual Risk-Informed Action Plan) তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই পরিকল্পনাগুলো অনেক সময় কেবল সভা রেজুলেশনে সীমাবদ্ধ থেকে যায় এবং ইউনিয়ন পরিষদের মূল বাজেট পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয় না। ফলে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও অভিযোজন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না।

 

পরিকল্পনা যতই বাস্তবসম্মত হোক না কেন, তা যদি বার্ষিক বাজেটে অর্থ বরাদ্দ না পায়, তবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই বাজেট সংযুক্তি করা খুবই জরুরি। একই সাথে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে হলে বাজেট তৈরিতে বাজেট সংযুক্তি করতেই হবে। বার্ষিক বাজেট প্রক্রিয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করলে স্থানীয় সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পরিকল্পনা ও বাজেট একীভূত হলে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়।

 

জাতীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য: স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ ও বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন জরুরি, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্যোগ ঝুঁকি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ অনুযায়ী টউগঈ-কে স্থানীয় পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাজেটে দুর্যোগ পরিকল্পনার প্রতিফলন কীভাবে সম্ভব? UDMC প্রস্তুত করা বার্ষিক অ্যাকশন প্ল্যান ইউনিয়ন পরিষদের অউচ (Annual Development Plan) ও ত্রৈমাসিক বাজেট চক্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিকল্পনা তৈরির সময় বাজেট লাইন আইটেম নির্ধারণ করে প্রস্তাব দিতে হবে (যেমন: আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার, রাস্তা মেরামত, দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মশালা, নারীদের জন্য পৃথক নিরাপদ স্থান ইত্যাদি)। ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিকল্পনা সভা ও বাজেট শুনানিতে এই পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।

 

বাজেট সংযুক্তির সুফল হিসেবে দ্রুত ও পূর্বপ্রস্তুতিতে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন গ্রহণের প্রস্তুতি বাড়ে, যেমন: GCF বা LDCF-এর তহবিল পেতে বাজেট পরিকল্পনা ও রিপোর্টিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক জনগণের চাহিদাভিত্তিক সেবা নিশ্চিত হয়, যেমনঃ খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, আশ্রয়। UDMC-এর পরিকল্পনাকে ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট প্রক্রিয়ার সাথে একীভূত করা মানে শুধু “প্রতিবেদন তৈরি” নয়, বরং এটি বাস্তব কাজের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ বরাদ্দের নিশ্চয়তা। এটি দুর্যোগ সহনশীলতা ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রকে টেকসই ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে।

 

জলবায়ু সুশাসন ও জলবায়ু অর্থায়নের ইতিবাচক প্রভাব: বাংলাদেশ এখন জলবায়ু সুশাসন (Climate Governance) ও জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance) ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অগ্রগামী। এই দুই প্রক্রিয়া ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য স্থানীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি: জলবায়ু অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাসে বরাদ্দকৃত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তহবিল ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছালে, তারা স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে।

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়তা: নারী, জেলে, কৃষক, ভূমিহীন পরিবারসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর (যেমন-হিজড়া, দলিত, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি) অভিযোজন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সহায়তা নিশ্চিত করা যাবে।

উপজেলা দূর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এ উপজেলায় বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হয়ে থাকে। এর ফলে নদী ভাঙন বৃদ্ধি পায়। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। শহর রক্ষা বাঁধ বা গ্রাম রক্ষায় যে বাঁধ নির্মাণ করা হয় তা নিমিষেই ভেঙে পড়ে। ক্রমান্বয়ে এগুলো বাড়ে কমে না। এর মুল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এগুলো সব প্রাকৃতিক দূর্যোগ। সুতরাং আমরা শত বাঁধ নির্মাণ বা প্রচেষ্টা চালালেও প্রাকৃতিক শক্তি রোধ করা অসম্ভব। যতক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব না কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু আমাদের মাথাব্যাথা না এটার ভুক্তভোগী পুরো বিশ্ব।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানজিলা আক্তার বলেন, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে উপজেলার সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষকরা। শত শত হেক্টর আবাদি জমি নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক তার কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে পারে না। বন্যার পানি অতিরিক্ত লবনাক্ত হওয়ায় কৃষি পণ্য মরে পচে যায়। এ উপজেলা ধান, ডাল, কলই, মটরশুঁটি, সূর্যমুখি, মুগডাল, বাদাম ইত্যাদি চাষাবাদ হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সময় হওয়ার আগেই মাঠে পানি উঠে যায়। আবার যখন পানির প্রয়োজন হয় তখন মাঠ শুকিয়ে থাকে। প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হয়। 


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বশির গাজী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের জীবন ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশ ছয়টি ঋতুর দেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন শীত আর গ্রীষ্ম ছাড়া অন্য কোনো ঋতু উপলব্ধি করতে পারছি না। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রেমালে এই উপজেলার ২০০০ পরিবারের অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাধ ভেঙে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে। রাস্তা নদীতে চলে গেছে। বদনীখালী এলাকার নদীর পাশ্ববর্তী একটা গ্রাম বসত ভিটা সহ নদীতে চলে গেছে। কৃষির ক্ষতি হয়েছে। আমার যে উপজেলা পরিষদ তার ৬০০ মিটার পরই বিষখালী নদী। তাও ভাঙতে ভাঙতে এখন ২০০ মিটারে চলে এসেছে প্রায়। নদী ভাঙন রোধে সর্বোচ্চ কাজ করলেও যতক্ষনে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিবাচক না হবে ততক্ষণে আমরা মুক্তি পাচ্ছি না। 
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় এনজিও সংগঠন জাগোনারী'র নির্বাহী পরিচালক হোসনেয়ারা হাসি বলেন, আমরা বরগুনা জেলা সহ পটুয়াখালী জেলায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। বেতাগীতে সিডর, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ে ইমার্জেন্সি রেসপন্স হিসেবে কাজ করেছি। সর্বশেষ আমরা ঘূর্ণিঝড় রেমালে বেতাগীর চার ইউনিয়নে ৮০০ পরিবারকে নগদ অর্থ ও খাবার সামগ্রী দিয়েছি। চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার করেছি। এ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আরও ভালোভাবে ভাবতে হবে। অধিকতর গাছ রোপন করতে হবে। নদী শাসন কমিয়ে আনতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে।

 

لم يتم العثور على تعليقات