৪১টি বই থেকে ৩৪৭: নেত্রকোনায় জ্ঞান বিস্তারে আলোকবর্তিকা আল-রুমানের ‘জ্ঞানের উৎস’.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

৪১টি বই থেকে ৩৪৭: নেত্রকোনায় জ্ঞান বিস্তারে আলোকবর্তিকা আল-রুমানের ‘জ্ঞানের উৎস’..

Asif Khan avatar   
Asif Khan
৪১টি বই থেকে ৩৪৭: নেত্রকোনায় জ্ঞান বিস্তারে আলোকবর্তিকা আল-রুমানের ‘জ্ঞানের উৎস’..
৪১টি বই থেকে ৩৪৭: নেত্রকোনায় জ্ঞান বিস্তারে আলোকবর্তিকা আল-রুমানের ‘জ্ঞানের উৎস’..
ছবি: সংগৃহীত

অসুস্থতার কারণে নিজের স্বপ্নভঙ্গ হলেও নেত্রকোনার দুর্গাপুরের তরুণ আল-রুমান হাসান মাত্র ৪১টি বই নিয়ে শুরু করেছিলেন ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগার’, যা বর্তমানে সাতটি গ্রামের মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে।..

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার চণ্ডীগড় ইউনিয়নের পাথারিয়া গ্রামের তরুণ আল-রুমান হাসান ব্যক্তিগত প্রতিকূলতাকে জয় করে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য সামাজিক বিপ্লব। শারীরিক অসুস্থতার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার আক্ষেপকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগার’। মাত্র ৪১টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই পাঠাগারটি বর্তমানে ৩৪৭টি বই, ১৯টি ম্যাগাজিন ও নিয়মিত পত্রিকার এক সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। শুধু পাথারিয়া গ্রাম নয়, বরং আশপাশের সাতটি গ্রামে বই পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক জনপদে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই উদ্যোগটি মূলত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বপ্ন থেকে শুরু হলেও বর্তমানে তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, যা স্থানীয় শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

পাঠাগারটির কার্যক্রম শুধু বই আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ও বহুমুখী সামাজিক কর্মকাণ্ডের গভীর প্রভাব। বর্তমান সময়ে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিড়ে বই পড়ার আগ্রহ কমছে, তখন আল-রুমানের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস স্থানীয় পর্যায়ে পাঠকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পাঠাগারের পাঠকদের মতে, এটি তাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করেছে এবং নিয়মিত পাঠচক্র ও কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারা নতুন নতুন বিষয়ে জানার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা এখান থেকে বিনামূল্যে বই সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের শিক্ষার পথ সুগম করছে। আল-রুমান হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, একটি বই একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে এবং একজন আলোকিত মানুষ একটি সমাজকে পরিবর্তনের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে। এই দর্শনই তাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরন্তর কাজ করে যেতে উৎসাহিত করছে।

এই উদ্যোগকে টেকসই করার লক্ষ্যে আল-রুমান ১৩ সদস্যের পরিচালনা কমিটি এবং ১৩ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছেন, যা পাঠাগারের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট, বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নয়নযোগী আশ্রমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মতো জনকল্যাণমূলক কাজগুলো পাঠাগারটিকে একটি বহুমুখী সামাজিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি বা বড় কোনো সংস্থার সহায়তা ছাড়াই একজন তরুণের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সঠিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমিত সম্পদের মধ্যেও বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এই পাঠাগারকে আধুনিক জ্ঞানকেন্দ্রে রূপ দিতে এবং এর পরিধি আরও বিস্তৃত করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিত্তবানদের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আল-রুমান হাসান পাঠাগারটির নিজস্ব আধুনিক ভবন নির্মাণ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর শাখা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং বিজ্ঞান মেলা আয়োজনের মাধ্যমে তিনি একটি সমন্বিত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। আল-রুমানের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়েও একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প সমাজ গঠনে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রান্তিক জনপদের মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার এই নিরবচ্ছিন্ন লড়াই কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং একটি শিক্ষিত ও সচেতন প্রজন্ম তৈরির পথে এক সাহসী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

Walang nakitang komento


News Card Generator