সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট: লাভ কার, ক্ষতি কার? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট: লাভ কার, ক্ষতি কার?

শারমিন আক্তার  avatar   
শারমিন আক্তার
সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট: লাভ কার, ক্ষতি কার?
সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট: লাভ কার, ক্ষতি কার?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের 'এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফর্মেশন' (EST) প্রকল্পের অনুমোদন এবং তার অধীনে...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের 'এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফর্মেশন' (EST) প্রকল্পের অনুমোদন এবং তার অধীনে সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট বিক্রির সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এই প্রকল্পের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও কার্বন সঞ্চয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যার ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে, এই কার্বন ক্রেডিট থেকে সম্ভাব্য লাভ এবং এর বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলি নিয়ে পরিবেশবিদ, স্থানীয় সম্প্রদায় ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। বিশেষ করে, এই কার্বন ক্রেডিট বিক্রির প্রক্রিয়া, এর থেকে অর্জিত অর্থ বন্টন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর এর প্রভাব নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব একটি উদ্বেগের কারণ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগকে দেশের জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন।

সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট বিক্রির ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য একটি আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক সুযোগ বলে মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে জটিল কিছু প্রশ্ন। কার্বন ক্রেডিট মূলত এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কার্বন ডাই অক্সাইড বা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসকারী প্রকল্পগুলোকে কার্বন ইউনিট আকারে সনদ দেওয়া হয়, যা পরে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। সুন্দরবনের মতো একটি বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, যা প্রাকৃতিকভাবেই বিশাল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে, তা নিঃসন্দেহে কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনের একটি বিশাল উৎস। কিন্তু এই ক্রেডিট কে বিক্রি করবে, এর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কী হবে, এবং এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এবং BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি খাতে কার্বন নির্গমন কমানোর বিভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করলেও, সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক বনের কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় তাদের সরাসরি ভূমিকা এখনো নির্ধারিত হয়নি। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং এর মূল্য প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণের উপর নির্ভর করে। তাই, এই বাজার থেকে স্থিতিশীল ও প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলো প্রায়শই 'সবুজ ধোঁয়াশা' (greenwashing) এর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, যেখানে প্রকৃত পরিবেশগত সুবিধার চেয়ে আর্থিক লাভের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়।

কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং তাদের অধিকার সুরক্ষা অপরিহার্য। সুন্দরবনের কার্বন ক্রেডিট বিক্রির ক্ষেত্রে, এই অঞ্চলের হাজার হাজার মৎস্যজীবী, মৌয়াল এবং বনজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকা ও ঐতিহ্যবাহী অধিকারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলো তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যেমন – বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধি বা সংরক্ষিত এলাকার সম্প্রসারণ, তবে তা স্থানীয় দারিদ্র্য বাড়াতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এবং BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতির গবেষণা ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সুন্দরবনের মতো একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, কার্বন ক্রেডিট থেকে অর্জিত মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া এই ধরনের প্রকল্প কেবল স্বল্পমেয়াদী লাভের দিকেই ধাবিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং এর উপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বছর সুন্দরবনের কার্বন সঞ্চয় (টন CO2eq) আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট গড় মূল্য (USD/টন) সুন্দরবন সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের হার (%) পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু তহবিলে বরাদ্দ (মিলিয়ন BDT)
২০১৩ ১,২১৪,৩০০,০০০ ৪.৫০ ৩২.৫ ৪,৫০০
২০১৮ ১,২১২,০০০,০০০ ৩.২০ ৩০.১ ৫,২০০
২০২২ ১,২১৪,৫০০,০০০ ৬.৮০ ২৮.৮ ৬,০০০
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ১,২১৪,৮০০,০০০ ৮.৫০ ২৭.৫ ৬,৫০০

উৎস: বন অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট 'সুন্দরবন কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনা নীতি' প্রণয়ন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের স্বচ্ছতা মানদণ্ড অনুসরণ করবে এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের কমপক্ষে ৫০% সরাসরি সুন্দরবন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় নিশ্চিত করবে।
  • DAE এবং BARI এর সহযোগিতায়, সুন্দরবন সংলগ্ন কৃষি জমিতে জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতি, যেমন - লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত (BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত) এবং স্বল্প-কার্বন নির্গমনকারী কৃষি প্রযুক্তি (BARC কর্তৃক পরীক্ষিত) প্রবর্তনের জন্য একটি সুসংহত প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যা কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং স্থানীয় কৃষকদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
  • স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বন বিভাগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন 'সুন্দরবন কার্বন ক্রেডিট পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করতে হবে, যা কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের সমস্ত আর্থিক লেনদেন, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর এর প্রভাব নিয়মিত নিরীক্ষণ করবে এবং এর প্রতিবেদন পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন আক্তার

শারমিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator