সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল ২০৩০' এর প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং অব্যবস্থাপনা পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টির পাশাপাশি সার্কুলার অর্থনীতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত মালচিং ফিল্ম, সেচ পাইপ, চারা উৎপাদন ট্রে এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের প্যাকেজিং উপকরণগুলো মাটির উর্বরতা হ্রাস, জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে। যদিও এই কৌশলপত্রে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং রিসাইক্লিং অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে এখনও ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
প্লাস্টিক বর্জ্যের এই অদৃশ্য হাতছানি কেবলমাত্র শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষিক্ষেত্রেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ২৫% কৃষি জমিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য, বিশেষ করে নিম্নমানের পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন কণা, মাটির মাইক্রোবায়াল কার্যকলাপকে ব্যাহত করছে এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে। এই প্লাস্টিকগুলি ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়ে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করছে। সার্কুলার অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বর্জ্যের সর্বনিম্ন উৎপাদন, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ এই লক্ষ্য অর্জনে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। কৃষকদের মাঝে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রীর সঠিক নিষ্পত্তি এবং পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এর মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও এই বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, কারণ রিসাইক্লিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা অনুপস্থিত।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার অর্থনীতিকে কার্যকর করতে হলে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের যে পরিমাণ উৎপাদিত হয়, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত হয়, যেখানে পরিবেশগত মানদণ্ড প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কৃষি বর্জ্য থেকে বায়োচার উৎপাদন এবং কম্পোস্টিংয়ের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিগুলোর প্রচলন থাকলেও প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য এমন কার্যকর ও সমন্বিত পদ্ধতি এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। প্লাস্টিকের গুণগত মান এবং প্রকারভেদের ভিন্নতা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত মালচিং ফিল্ম প্রায়শই মাটি ও জৈব পদার্থ দ্বারা দূষিত থাকে, যা এর পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যবহৃত মাল্টি-লেয়ার প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের রিসাইক্লিং প্রযুক্তি এখনও ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়। এর ফলে, একদিকে যেমন মূল্যবান সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের উপর চাপ বাড়ছে। কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থার অভাবে এই প্লাস্টিকগুলো হয় ল্যান্ডফিলে যাচ্ছে, নয়তো অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, যা বায়ুদূষণ এবং কার্বন নিঃসরণে অবদান রাখছে।
| প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎস | উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ (টন/বছর) | পুনর্ব্যবহারকৃত প্লাস্টিক বর্জ্যের অনুপাত (%) | ল্যান্ডফিলে জমা (%) | পরিবেশে উন্মুক্ত (%) |
|---|---|---|---|---|
| প্যাকেজিং (খাদ্য ও পানীয়) | ৮,০০,০০০ | ২৫ | ৫০ | ২৫ |
| কৃষি (মালচিং ফিল্ম, পাইপ) | ১,৫০,০০০ | ১০ | ৬০ | ৩০ |
| গৃহস্থালি ও ভোক্তা পণ্য | ৪,৫০,০০০ | ৩০ | ৪৫ | ২৫ |
| অন্যান্য শিল্প | ২,০০,০০০ | ৪০ | ৩৫ | ২৫ |
| মোট | ১৬,০০,০০০ | ~২৬ | ~৪৮ | ~২৬ |
উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২২-২০২৩
সুপারিশ
- পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২২' এর অধীনে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট 'বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা' (Extended Producer Responsibility - EPR) নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় উৎপাদকদের তাদের পণ্যের জীবনচক্রের শেষ পর্যন্ত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, যার মধ্যে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্পত্তির ব্যয়ভার বহন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) কে BARI এবং BRRI এর সাথে যৌথভাবে কৃষকদের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব নিষ্পত্তির বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এক্ষেত্রে 'কৃষি সম্প্রসারণ আইন, ২০১৫' এর আওতায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য বিশেষ মডিউল তৈরি করে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে এবং রিসাইক্লিং উপযোগী প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
- BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) কে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে উদ্ভাবনী রিসাইক্লিং প্রযুক্তি এবং বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের বিকল্প নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। 'জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৮' এর আলোকে প্লাস্টিক বর্জ্যকে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী নতুন পণ্যে রূপান্তরের (যেমন: প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি, প্লাস্টিক-কম্পোজিট নির্মাণ সামগ্রী) সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করতে হবে।