চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। উপজেলার ৪১টি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১৫টি মাদ্রাসা থেকে অংশগ্রহণকারী হাজারো শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৫৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপজেলায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র ৮৯ জনে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অত্যন্ত হতাশাজনক। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পাসের হারে। বিশেষ করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ফুটে উঠেছে, যা অভিভাবক ও সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ফলাফল প্রকাশের পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন যে, দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়া এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খেয়েছে। যদিও পোমরা শহীদ জিয়া আনসারী উচ্চ বিদ্যালয় ৭২ দশমিক ৯২ শতাংশ পাসের হার নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে এবং রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ১৪ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, তবুও সামগ্রিক চিত্রটি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে, সেখানকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, পাঠ্যপুস্তকের বাইরের গাইড বই নির্ভরতা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত তদারকির অভাবই মূলত এমন করুণ ফলাফলের জন্য দায়ী। মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে রাঙ্গুনিয়া নুরুল উলুম কামিল মাদ্রাসা ৮৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পাসের হার নিয়ে শীর্ষে থাকলেও অন্যান্য মাদ্রাসার পারফরম্যান্স সন্তোষজনক নয়।
এই ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের একাংশ দায় এড়িয়ে অজুহাত হিসেবে করোনাকালীন সময়ের শিখন ঘাটতি এবং শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতার কথা তুলে ধরছেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবই এই ব্যর্থতার মূল কারণ। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের এই বৈষম্য শিক্ষার মান বণ্টন যে অসম, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। স্থানীয় শিক্ষাবিদদের দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফলাফল করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ফলাফল পর্যালোচনার নামে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাঙ্গুনিয়ার এবারের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার এই নাজুক ফলাফল পুরো অঞ্চলের শিক্ষা খাতকে এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এই শিক্ষার্থীরা কতটা যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারবে, তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষার এই নিম্নমুখী প্রবণতা রোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে উপজেলার মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং শিক্ষা বোর্ড যদি এখনই এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় না আনে, তবে রাঙ্গুনিয়ার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনাই এখন সময়ের দাবি।