🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

ভূমি দুর্নীতির দুষ্টচক্র: কেন থামছে না সাধারণ মানুষের ভোগান্তি?....

সাজিদুল ইসলাম  avatar   
সাজিদুল ইসলাম
ভূমি দুর্নীতির দুষ্টচক্র: কেন থামছে না সাধারণ মানুষের ভোগান্তি?....
ভূমি দুর্নীতির দুষ্টচক্র: কেন থামছে না সাধারণ মানুষের ভোগান্তি?....
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা এক জটিল ও কুখ্যাত দুর্নীতির আখড়া। জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে নামজারি এবং সর্বশেষ জরিপ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষকে পড়ত.......

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা এক জটিল ও কুখ্যাত দুর্নীতির আখড়া। জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে নামজারি এবং সর্বশেষ জরিপ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় সীমাহীন ভোগান্তি ও দুর্নীতির বেড়াজালে। আই নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কীভাবে ভূমি অফিসের কর্মচারী, অসাধু দালাল চক্র এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশে এই দুর্নীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে তাদের শেষ সম্বল, বিশ্বাস এবং বিচার পাওয়ার অধিকার। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার পথে এক বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষ করে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও, দলিল লেখকদের মাধ্যমে শুরু হয়ে সাব-রেজিস্ট্রার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও অবৈধ অর্থের লেনদেন এখন যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরেও ‘ঘুষ’ বা ‘অতিরিক্ত বকশিশ’ হিসেবে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। দলিল জালিয়াতি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কম মূল্য দেখানো, এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসব অপকর্মের মাধ্যমে অসাধু চক্র একদিকে নিজেদের পকেট ভারী করছে, অন্যদিকে ভূমি মালিকদের আইনি অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এই দুর্নীতির কারণে অনেক সময় নিরীহ মানুষ তার পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অথবা বছরের পর বছর ধরে আইনি জটিলতায় আটকা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়াও দুর্নীতির আরেক বড় ক্ষেত্র। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড কার্যালয়গুলোতে নামজারি করাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ই-নামজারি পদ্ধতি চালু হলেও, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন অজুহাতে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে এবং দালালদের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ দাবি করে। দ্রুত কাজ করিয়ে দিতে বা কোনো জটিলতা নিরসনে ‘বিশেষ খরচ’ দিতে বাধ্য করা হয়। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা এখনো বহুলাংশে অস্বচ্ছ। অনেক সময় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বা আসল মালিকের অজান্তেই নামজারি করিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর জালিয়াতির ঘটনাও ঘটে, যা পরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের জন্ম দেয়। এসব জালিয়াতি ভূমি অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশ ছাড়া অসম্ভব।

জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত দুর্নীতিও কম নয়। ভূমি জরিপকারী বা আমিনেরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে জমির পরিমাপ ও সীমানা নির্ধারণে ইচ্ছাকৃত ভুল করে বা পক্ষপাতিত্ব করে থাকেন, যার ফলে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সামান্য অর্থের বিনিময়ে জরিপের ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়ার অভিযোগও সাধারণ। ভূমি ব্যবস্থাপনার এই তিনটি মূল স্তম্ভ — রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ — একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি ধাপে জালিয়াতি হলে তার প্রভাব অন্য ধাপগুলোতেও পড়ে এবং সমস্যার জাল আরও বিস্তৃত হয়। এই দুর্নীতির কারণে ভূমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা বিচার ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগের বিষয়ে অবগত থাকলেও, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

এই দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা। বর্তমান ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী ও নির্ভুল করতে হবে, যেখানে মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে সর্বনিম্ন। ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে অন্যরা এমন কাজ করতে সাহস না পায়। ভূমি সংক্রান্ত আইন ও প্রক্রিয়াগুলোকে আরও সহজবোধ্য করে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে, যাতে তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হয়। সরকারের সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই দীর্ঘদিনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

সুপারিশ: ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক: ১. ই-রেজিস্ট্রেশন ও ই-নামজারি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অটোমেটেড ও নির্ভুল করে তোলার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা। ২. ভূমি অফিসের প্রতিটি ধাপে সেবা প্রদানের জন্য নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে অভিযোগ জানানোর জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। ৩. সাব-রেজিস্ট্রার, এসি ল্যান্ড ও ভূমি কর্মকর্তাদের নিয়মিত সম্পদের হিসাব নিরীক্ষা করা এবং দুর্নীতি প্রমাণিত হলে কঠোর বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৪. দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা এবং তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৫. ভূমি আইন ও বিধিমালাগুলোকে সহজবোধ্য করে জনগণের কাছে প্রচার করা এবং ভূমি সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা। ৬. দুর্নীতি দমন কমিশনকে ভূমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। ৭. ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা এবং আদালতের বাইরে দ্রুত সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি করা।


🔎 অনুসন্ধানে: সাজিদুল ইসলাম

সাজিদুল ইসলাম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ দুর্নীতি

No se encontraron comentarios


News Card Generator