ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণের চাপ: ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে সুদের বাধা

রাশেদ চৌধুরী  avatar   
রাশেদ চৌধুরী
ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণের চাপ: ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে সুদের বাধা
ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণের চাপ: ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে সুদের বাধা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রানীতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের পরিমা...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রানীতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০% বেশি। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবদানই সিংহভাগ। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর, বিশেষত উচ্চ সুদের হারের মাধ্যমে।

সরকারের এই বৃহৎ ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্যের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো, সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে তুলনামূলক নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন মনে করে। যখন সরকার উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যক্তি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য তহবিল কমে যায় এবং ব্যক্তি খাতের ঋণের সুদের হারও বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বছরের পর বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকছে, যা সরকারের উচ্চ ঋণ গ্রহণের প্রবণতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৩৭%, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্ষেপিত লক্ষ্যমাত্রা ১৪.১% এর চেয়ে অনেক কম। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও শ্লথ করে দিচ্ছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের অভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আসছে।

সরকারি ঋণের এই উচ্চ চাহিদা সুদের হার বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক চালু করা স্মার্ট (SMART) রেট পদ্ধতি, যা ছয় মাস মেয়াদী ট্রেজারি বিলের গড় সুদ হারকে ভিত্তি ধরে নির্ধারিত হয়, তা সরকারের উচ্চ ঋণ গ্রহণের কারণে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। মার্চ ২০২৪-এ স্মার্ট রেট ছিল ১১.৭৬%, যা পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই উচ্চ স্মার্ট রেট বেসরকারি খাতের ঋণের সুদের হারকে সরাসরি প্রভাবিত করছে, কারণ ব্যাংকগুলো এর সাথে অতিরিক্ত মার্জিন যোগ করে ঋণ বিতরণ করে। BIBM (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ সুদের হার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং কৃষি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ গ্রহণকে আরও কঠিন করে তুলছে, যা তাদের উৎপাদনশীলতা এবং সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই চাপ শুধু নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করছে, কারণ উচ্চ সুদের কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সরকারি ব্যাংকগুলোর উপর সরকারের ঋণের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থবছর সরকারি ব্যাংক ঋণ (ট্রিলিয়ন টাকা) বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি (%) SMART রেট (গড়, %)
২০২১-২২ ০.৬২ ১৩.৬৬ ৫.৫২
২০২২-২৩ ০.৮৯ ১০.৫৭ ৭.৫৩
২০২৩-২৪ (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ১.০৭ ১০.৩৭ (ডিসেম্বর ২০২৩) ১১.৭৬ (মার্চ ২০২৪)

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, BIBM

সুপারিশ

  • সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস, যেমন সঞ্চয়পত্র ও বিদেশী ঋণ, ব্যবহারের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা থাকবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং সুদের হার স্থিতিশীল রাখতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলাম প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এককভাবে উচ্চ সুদে ঋণ দিতে উৎসাহিত না হয়।
  • ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এবং সুদের হারের চাপ কমাতে, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ বৃদ্ধি করতে হবে এবং সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও প্রণোদনা প্রদান করতে হবে, যা 'ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১' এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাশেদ চৌধুরী

রাশেদ চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংকিং, মানি মার্কেট ও সুদের হার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator