বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ফারহান ফুয়াদ  avatar   
ফারহান ফুয়াদ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ (U.S. Department of Commerce) ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনের বিরুদ্ধে নতুন করে উচ্চ প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ...

সম্প্রতি, মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ (U.S. Department of Commerce) ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনের বিরুদ্ধে নতুন করে উচ্চ প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চিপ রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যা বেইজিং-এর প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সরাসরি আঘাত হেনেছে। ওয়াশিংটন-এর এই পদক্ষেপ, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে প্রণীত, তা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েনই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথকেও প্রভাবিত করছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে 'অর্থনৈতিক জবরদস্তি' এবং 'মুক্ত বাণিজ্য নীতির লঙ্ঘন' হিসেবে আখ্যায়িত করে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর সত্য, মিথ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের মূল সত্য নিহিত রয়েছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভাজন এবং কৌশলগত সম্পদ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। ওয়াশিংটন যেখানে চীনের 'সামরিক-বেসামরিক সংমিশ্রণ' (Military-Civil Fusion) নীতিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে, সেখানে বেইজিং মার্কিন পদক্ষেপগুলোকে তাদের উন্নয়নের গতি রোধ করার অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন CHIPS and Science Act, যা অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ৫২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ভর্তুকি প্রদান করছে, তা চীনের প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি সরাসরি পাল্টা জবাব। এর প্রতিক্রিয়ায়, চীন নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজগুলির রপ্তানির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই পদক্ষেপগুলো কেবল বাণিজ্য ঘাটতি বা শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে পুনর্গঠন করছে, বিশেষ করে ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো, যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনের বাইরে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো কেবল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাই নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ধারণাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মতো বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এই অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের চারপাশে বেশ কিছু মিথ প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো 'সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ' (complete decoupling) বা চীনের অর্থনীতি থেকে পশ্চিমা অর্থনীতির সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীর আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে এটি প্রায় অসম্ভব। বরং, আমরা 'ঝুঁকি হ্রাস' (de-risking) প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, যেখানে দেশগুলো তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলকে বৈচিত্র্যময় করে তুলছে এবং একক উৎসের উপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায়, উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশ, উভয় পরাশক্তির বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। তবে, এই সুযোগের সাথে ভূ-রাজনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে দেশগুলোকে প্রায়শই উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্লু ডট নেটওয়ার্ক (Blue Dot Network) বা পার্টনারশিপ ফর গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (PGII) প্রকল্পগুলো অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একটি কঠিন পছন্দের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর দেশগুলো কীভাবে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে এবং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কৌশল গ্রহণ করবে, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই জোটগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে শক্তিশালী করা এখন আরও বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে তারা উভয় পরাশক্তির চাপ মোকাবেলা করে নিজেদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ শুধু বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে যা আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বৈশ্বিক শাসনকেও প্রভাবিত করছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রায়শই অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক ভিন্নমত পরিলক্ষিত হয়, যা এমনকি UN Peacekeeping মিশনগুলোর ম্যান্ডেট এবং অর্থায়নেও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যেখানে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন দেখা যায়, যা কখনও কখনও মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। একইভাবে, জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতেও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সহযোগিতা ব্যাহত করছে। যখন দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি একে অপরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা দেখা দেয়, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেও চ্যালেঞ্জ করছে, কারণ দেশগুলো ক্রমশ জাতীয় স্বার্থকে বৈশ্বিক সহযোগিতার ঊর্ধ্বে স্থান দিচ্ছে।

বছর যুক্তরাষ্ট্রের চীন থেকে আমদানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) যুক্তরাষ্ট্রের চীনে রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ (সংখ্যা) মার্কিন প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ (সংখ্যা)
২০২০ ৪৪৬.৭ ১২৪.৬ ১২
২০২১ ৫০৫.৪ ১৫১.১ ১৫
২০২২ ৫৩৬.৩ ১৫৩.৮ ১০ ২০
২০২৩ (আনুমানিক) ৪২৯.৩ ১৪৮.৮ ১২ ২৫

উৎস: U.S. Census Bureau, China Customs, Peterson Institute for International Economics (PIIE) ও Center for Strategic and International Studies (CSIS) এর বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট 'অর্থনৈতিক কূটনীতি কৌশলপত্র' (Economic Diplomacy Strategy Paper) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের CHIPS Act এবং চীনের Belt and Road Initiative (BRI) উভয় থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জনের জন্য সুস্পষ্ট গাইডলাইন থাকবে এবং তৃতীয় দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করার জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা হবে। এই কৌশলপত্রে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যকরণের উপর জোর দিতে হবে।
  • BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি 'আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিস্থাপকতা চুক্তি' (Regional Supply Chain Resilience Agreement) স্বাক্ষর করা উচিত, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা বা পরাশক্তিগুলোর চাপ মোকাবেলায় সদস্য দেশগুলোকে একত্রিত করবে। এই চুক্তির আওতায়, সদস্য দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও প্রযুক্তির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিনিময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করবে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেবে এবং একক পরাশক্তির উপর নির্ভরতা হ্রাস করবে।
  • জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত UN Peacekeeping-এর মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব প্রশমিত করার জন্য সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা। বিশেষত, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC) এর মাধ্যমে একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করা যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতিমালার অধীনে উন্মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করার জন্য সকল রাষ্ট্রকে আহ্বান জানাবে এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উপর জোর দেবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান ফুয়াদ

ফারহান ফুয়াদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator