বন্দী কারাগারে, মুক্ত দুর্নীতি: কারা ব্যবস্থাপনার চিত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

বন্দী কারাগারে, মুক্ত দুর্নীতি: কারা ব্যবস্থাপনার চিত্র

নাফিসা রহমান  avatar   
নাফিসা রহমান
বন্দী কারাগারে, মুক্ত দুর্নীতি: কারা ব্যবস্থাপনার চিত্র
বন্দী কারাগারে, মুক্ত দুর্নীতি: কারা ব্যবস্থাপনার চিত্র
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার এক জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী তথ্যে এই...

বাংলাদেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার এক জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী তথ্যে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোন, মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে সাধারণ খাবার ও সাক্ষাৎ পর্যন্ত সব কিছুতেই চলছে অবাধ বাণিজ্য, যার নেপথ্যে জড়িত খোদ কারারক্ষী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একদিকে যেমন বন্দীদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে কারা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ছে।

কারাগারের অভ্যন্তরে আর্থিক লেনদেনের জাল এতটাই বিস্তৃত যে, টাকা দিলেই মেলে মোবাইল ফোন ও মাদকদ্রব্য। কারারক্ষীরা সরাসরি অথবা তাদের স্বজন বা কারাগারের আশপাশের দোকানের মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর ব্যবহার করে এই অবৈধ লেনদেন পরিচালনা করেন। কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন জেলারও কারারক্ষীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের এক বন্দীর স্বজন অভিযোগ করেছেন, অসুস্থতার অজুহাতে প্রথমে ১০০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং এরপর প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করা হতো। বন্দীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ভালো সিট বা ভিআইপি সুবিধা পেতেও অর্থের লেনদেন একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি খাবার, কম্বল, তোয়ালে, জুতা ঘিরেও বাণিজ্য চলে; চাহিদামতো টাকা না দিলে সাধারণ ওয়ার্ডে ঠাঁই মেলে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের বিভিন্ন কারাগারে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক দুই আইজি প্রিজন্স, বর্তমান চার ডিআইজি এবং বিভিন্ন কারাগারের জেল সুপার, জেলারসহ প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। কক্সবাজার কারাগারে ৪ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েও এক জেলার কর্তৃক কারাবন্দীকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এই লাগামহীন দুর্নীতি কারাগারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যা কারা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী একটি বড় সমস্যা। সিলেটের কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো অনেক স্থানে একটি কক্ষে ১০০ থেকে ১৩০ জন বন্দী গাদাগাদি করে থাকেন। বন্দীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার নিম্নমানের ও পরিমাণে অপর্যাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরও করুণ। কারা অধিদপ্তরের অনুমোদিত ১৫১টি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে মাত্র দুজন চিকিৎসক পদায়িত আছেন। বাকি কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে ১০১ জন চিকিৎসক কাজ করেন, যার ফলে ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার কারণে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কারা অধিদপ্তর ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯৩৩ জন বন্দী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, যার মধ্যে ২৭৫ জন মারা গেছেন হাসপাতালে নেওয়ার পথে। রাতের বেলায় অধিকাংশ কারাগারে চিকিৎসক না থাকা এবং অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া, কারাবন্দীদের ওপর নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও নিয়মিত উঠছে। অন্যদিকে, কারাগারে ভিআইপি বন্দীদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়টি বিতর্কিত। সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৪৩ জন ভিআইপি বন্দী ডিভিশন সুবিধা পাচ্ছিলেন, এবং মে ২০২৫ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৫৩ জন ভিআইপি বন্দী ছিলেন। বন্দীদের স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে, যা বন্দীদের সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ।

এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা অধিদপ্তর কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত সাত মাসে কারা অধিদপ্তরের ১২ জনকে চাকরিচ্যুত, ৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত, ২৭০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি এবং ২৬০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তিনি নিয়ম ভঙ্গকারীদের প্রতি কোনো ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে, এপ্রিল ২০২৬-এ নানা অভিযোগে তদন্তাধীন ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জনবল সংকটের কারণ দেখিয়ে কাজে পুনর্বহাল করা হয়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং আরও অপকর্মের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হলো, আগস্ট ২০২৬-এ কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এই প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি কারাগারের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী এবং জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকালে পালিয়ে যাওয়া ৬৯০ জন বন্দী এখনো পলাতক থাকার তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৬৬ জন বন্দীর পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য সার্ভার পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। কারাগার থেকে অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে বাইরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠে এসেছে পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে। গত এক বছরে প্রায় ৩০০০ মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। 'বাংলাদেশ জেল'-এর নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস' রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল ই-প্রিজন সার্ভিস, ডিজিটাল জামিন ও সাক্ষাৎ ব্যবস্থাপনা, অভিযোগ গ্রহণে হটলাইন চালু, ১৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল স্থাপন, ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনা এবং বন্দীদের পুনর্বাসনে কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্যানটিনে স্বচ্ছতা আনতে মুন্সিগঞ্জে আরএফআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দমনেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যেখানে গত দুই বছরে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর ও ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। যদিও এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আরও সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সুপারিশ: বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক উন্নতির জন্য অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন: প্রথমত, কারা অভ্যন্তরে সকল প্রকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং দোষী কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বন্দী রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং নতুন কারাগার নির্মাণ বা বিদ্যমান কারাগারগুলোর সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থান সংকট নিরসন করতে হবে। তৃতীয়ত, বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়োগ এবং কারা হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন করতে হবে। চতুর্থত, বন্দীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে খাবার ও অন্যান্য সুবিধার মান বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কোনো অনিয়ম যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, কারা কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং নিয়মিত ভেটিং ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা ও নৈতিকতা বৃদ্ধি করতে হবে। ষষ্ঠত, কারাগারগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন: জ্যামার, সিসিটিভি) ব্যবহার করে মোবাইল ফোন ও মাদকের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। পরিশেষে, কারা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া অত্যাবশ্যক।


🔎 অনুসন্ধানে: নাফিসা রহমান

নাফিসা রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: কারাগার ও প্রিজন ম্যানেজমেন্ট

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator