🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেটে দুর্নীতির কালো মেঘ: জবাবদিহিতার সংকট

রুহুল আমিন খান  avatar   
রুহুল আমিন খান
প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেটে দুর্নীতির কালো মেঘ: জবাবদিহিতার সংকট
প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেটে দুর্নীতির কালো মেঘ: জবাবদিহিতার সংকট
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়েছে। প্রতি ...

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়েছে। প্রতি বছর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি পেলেও, এই বিশাল অঙ্কের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রকট। এই পরিস্থিতি দেশের সামরিক সক্ষমতার আধুনিকায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উভয়কেই ঝুঁকিতে ফেলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক বেশ কয়েকটি উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা কেনাকাটার গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। এর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জাহাজ ও ক্রেন ক্রয়ে শত শত কোটি টাকার কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুদক। বিশেষত, মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন ৬টি জাহাজের জন্য বরাদ্দকৃত ২,৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৪টি জাহাজ কেনার মাধ্যমে ৪৮৬ কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নৌবাহিনী প্রধান নাজমুল হাসানকেও এসব দুর্নীতির অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও, মংলা বন্দরে ১,৫৩৮.১৯ কোটি টাকার 'অ্যানিমেল চ্যানেল কনজারভেশন ড্রেজিং' প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

শুধু নৌবাহিনী নয়, বিমান বাহিনী এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতিসাধন, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুদক। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান বাহিনীর কেনাকাটায় দুর্নীতি ও বিতর্ক দীর্ঘদিনের সঙ্গী। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে রাডার কেনা নিয়ে ঘুসের অভিযোগ এবং সামরিক ক্রয়ে 'কমিশন বাণিজ্য' একটি প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ১০০ টাকার জিনিস ২৫০ টাকায় কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এটি সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতের অংশ নয়, তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ২১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১,১৬১ কোটি টাকার দুর্নীতি মামলার ঘটনাও রাষ্ট্রীয় ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পুরনো বিমান ইজারা নিয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিরক্ষা বাজেট প্রতি বছর বৃদ্ধি পেলেও এর ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১,৫৯৩ কোটি টাকা বেশি। তবে, এই বিশাল বরাদ্দের কতটা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হচ্ছে এবং কতটা বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' বাস্তবায়নের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্য থাকলেও, বাজেটের বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে যাওয়ায় প্রকৃত আধুনিকায়ন কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া, সম্প্রতি সেনানিবাসের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানির মাধ্যমে ১,১০০ কোটি টাকার রেডিও ডিভাইস অ্যাসেম্বলিং প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক উঠেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বারবার উল্লেখ করেছে। তাদের ২০২০ সালের 'গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টেগ্রিটি ইনডেক্স' অনুযায়ী, বিশ্বের ৬২ শতাংশ দেশই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বাংলাদেশও এই তালিকায় 'অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ' অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে জনগণের কাছে তথ্য প্রকাশ করা হয় না এবং সংসদেও এ নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয় না, যা দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করে। এমনকি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেও অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সেমিনারে বক্তারা অভিমত দিয়েছেন, যা সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।

সুপারিশ: প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর 'প্রতিরক্ষা ক্রয় নিরীক্ষা কমিটি' গঠন করা উচিত। এই কমিটিতে সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞ, সংসদ সদস্য এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সকল প্রতিরক্ষা ক্রয় চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত নিরীক্ষা ও তদারকির ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। এছাড়াও, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রতিরক্ষা খাতের দুর্নীতি তদন্তে আরও স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় জনবল সরবরাহ করা উচিত এবং দোষী প্রমাণিতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: রুহুল আমিন খান

রুহুল আমিন খান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেট ওয়াচ

Комментариев нет


News Card Generator