পুঁজিবাজারে দুর্নীতির কালো থাবা: বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

পুঁজিবাজারে দুর্নীতির কালো থাবা: বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি

তানভীর হোসেন  avatar   
তানভীর হোসেন
পুঁজিবাজারে দুর্নীতির কালো থাবা: বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
পুঁজিবাজারে দুর্নীতির কালো থাবা: বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আবারও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি, অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে তলানিতে ঠেলে দিয়েছে। 'আই নিউজ বিডি'-র অনু...

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আবারও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি, অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে তলানিতে ঠেলে দিয়েছে। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই খাতটিতে সুশাসনের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী মহলের কারসাজি বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নিরন্তর 'সিকিউরিটিজ জেনোসাইড'-এর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে আসায় বাজারের গভীরতর সমস্যাগুলো প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক সংকটই নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের অনিয়মের একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে ২৫৬ কোটি টাকার বেশি শেয়ারবাজার কারসাজি ও অর্থ আত্মসাতের মামলা অন্যতম। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের জুনে (এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আপডেট) এই মামলা দায়ের করে এবং এর তদন্ত প্রতিবেদন আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুনে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শেয়ারবাজারে অনিয়ম, কারসাজি ও বিতর্কিত লেনদেনের ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, সাবেক কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান-এর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তবে, এই জরিমানার কত টাকা আদায় হয়েছে বা কতগুলো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

পুঁজিবাজারে দুর্নীতির ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয় বেস্ট হোল্ডিংস (লা মেরিডিয়ান হোটেল) কেলেঙ্কারিতে, যেখানে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানির মালিক আমিন আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে (২০২৪ সালের আগস্টের পর গঠিত) সাবেক মন্ত্রী, আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক ও উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনে জালিয়াতির অভিযোগও নিয়মিত। দুদক ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১০টি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের বিরুদ্ধে আইপিও জালিয়াতির তদন্ত শুরু করেছে। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে দুদক বিএসইসি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছিল, যেখানে দেখা যায়, কোম্পানির বানোয়াট উপার্জন ও উইন্ডো-ড্রেসড ব্যালেন্স শিটের ভিত্তিতে আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সুপারিশ প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি বিএসইসির অভ্যন্তরেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে; দুদক ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯ জন বিএসইসি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে। মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি-র বিরুদ্ধেও তথ্য প্রকাশে অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন খতিয়ে দেখতে বিএসইসি ২০২৬ সালের এপ্রিলে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

এই অনিয়ম ও দুর্নীতির চূড়ান্ত শিকার হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। মাত্র ৪৮ কার্যদিবসে (২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে, যা ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর ঘটেছিল। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর, যেখানে তথ্যসমৃদ্ধ অংশগ্রহণকারীরা ঊর্ধ্বগতির সময় বেরিয়ে যান এবং দরপতনের সময় কম দামে শেয়ার কিনে ফিরে আসেন, যা কম জ্ঞানসম্পন্ন বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বেশি প্রস্তুত বিনিয়োগকারীদের দিকে স্থানান্তরিত করে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর বিএসইসি কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও তা কারসাজি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ছিল না। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ১৫ বছরে জাল-জালিয়াতি, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও প্রতারণার মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা পরিমাপক জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, যা বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

দীর্ঘদিনের এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই পুঁজিবাজারে অনিয়মের পুনরাবৃত্তির মূল কারণ। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের কেলেঙ্কারির মূল হোতারা রাজনৈতিক সুরক্ষায় বিচার এড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, কর্পোরেট সুশাসনের অভাব এবং নীতিগত অসঙ্গতি কারসাজিকারীদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যদিও সরকার শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে মামলা পাঠানো হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছেন, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কেবল জরিমানা বা তদন্তের নির্দেশই যথেষ্ট নয়, বরং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

সুপারিশ: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা উচিত, যা শেয়ারবাজার সংক্রান্ত সকল অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করবে। এই ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে এবং এর রায় দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একইসাথে, বিএসইসির ক্ষমতা ও তদারকি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করে তুলতে হবে, যাতে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া, কর্পোরেট সুশাসন এবং বাজার কারসাজি প্রতিরোধে সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল গঠন এবং বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সচেতনভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।


🔎 অনুসন্ধানে: তানভীর হোসেন

তানভীর হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: শেয়ারবাজার ও সিকিউরিটিজ জেনোসাইড

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator