পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বেড়াজালে আ...

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ থাকলেও, বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো এই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে শুরু করে পর্যটন করপোরেশন পর্যন্ত নানা ধরনের আর্থিক অনিয়ম, ঐতিহাসিক স্থান দখল, পুরাকীর্তি পাচার এবং পর্যটকদের হয়রানির মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য ঐতিহ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, নিজেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে একটি বিশাল দুর্নীতি নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগ রয়েছে। তিনি সংস্কার, সংরক্ষণ, জরিপ ও খনন কাজের জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা অদক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে কাজগুলো অতি গোপনে সম্পন্ন করা হয় যাতে জনসমক্ষে না আসে। এছাড়া, ঐতিহাসিক স্থান ও জাদুঘরের নিদর্শনগুলোর সঠিক যত্নের অভাব দেখা যাচ্ছে। চন্দ্রিমা উদ্যানের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলো ক্রমশ দখল ও বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হচ্ছে। লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানা সংস্কারে রং বদলানোর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান মুজিবনগরও এখন 'ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি'তে পরিণত হয়েছে, যেখানে স্মৃতিচিহ্নগুলোর ক্ষয় এবং অযত্ন-অবহেলা স্পষ্ট। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মূলত খননকাজেই সীমাবদ্ধ এবং গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে, যা দেশের ৫১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও ২২টি জাদুঘরের সঠিক ব্যবস্থাপনার পথে বড় বাধা। এর পাশাপাশি, পুরাকীর্তি পাচার বাংলাদেশে একটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। দিনাজপুরে পাচারের সময় সাতটি প্রাচীন পুরাকীর্তি উদ্ধার করা হয়েছে সম্প্রতি। নওগাঁর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো পুরাকীর্তি পাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত না হওয়া এবং আইন যুগোপযোগী না হওয়াকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পর্যটন খাতেও সিন্ডিকেট, হয়রানি ও আর্থিক অনিয়ম একটি বড় সমস্যা। দেশের জনপ্রিয় পর্যটন স্পট যেমন কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও সিলেটের মতো স্থানগুলোতে স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সিলেটের প্রায় প্রতিটি পর্যটন স্পটেই নৌকা, অটোরিকশা, সিএনজি এমনকি খাবারের হোটেল পর্যন্ত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখা যায়, যেখানে পর্যটকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জাফলংয়ে পর্যটকদের ওপর হামলা (জুন ২০২৫) এবং ভোলার ইলিশাবাড়িতে কিশোর গ্যাংয়ের চাঁদাবাজি ও হামলার মতো ঘটনা দেশি পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। কক্সবাজারের মতো প্রধান পর্যটনস্থলে প্রতি ১ হাজার ২৫০ জন পর্যটকের জন্য মাত্র একজন নিরাপত্তা কর্মী থাকার তথ্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনেও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে (অক্টোবর ২০২৫)। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন দুর্নীতি ও বিমান ভাড়া করার ক্ষেত্রে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এমনকি দেশের চারটি বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কেনাকাটা ও দরপত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছে।

বাংলাদেশের পর্যটন খাত প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। ২০২৩ সালে মালদ্বীপ যেখানে পর্যটন থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার এবং নেপাল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, সেখানে বাংলাদেশের আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের নিচে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরার জন্য কার্যকর প্রচারণার অভাব, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে পিছিয়ে থাকা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। নীতিনির্ধারকদের আশার বাণী সত্ত্বেও, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, প্রচারণার অভাব এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার ত্রিমুখী চাপে দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। সম্প্রতি নতুন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রশিদুজ জামান মিল্লাত দায়িত্ব গ্রহণ করে বিমানের দুর্নীতি তদন্তে দুদকের সাথে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। সামুদ্রিক পর্যটন বিকাশে নতুন নীতিমালার খসড়াও অনুমোদিত হয়েছে। তবে এসব ইতিবাচক উদ্যোগের সুফল পেতে হলে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মূলোৎপাটন জরুরি।

দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে চলমান ও ভবিষ্যতের সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সকল আর্থিক লেনদেন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর দখল রোধে এবং অবৈধ বাণিজ্যিকীকরণ ঠেকাতে শক্তিশালী আইন প্রয়োগ ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পুরাকীর্তি পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, পর্যটন স্পটগুলোতে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে এবং পর্যটকদের হয়রানি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পর্যটন পুলিশকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। পর্যটকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ কেন্দ্র এবং হেল্পলাইন চালু করা যেতে পারে। পঞ্চমত, বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার জন্য কার্যকর ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ

نظری یافت نشد


News Card Generator