ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ  avatar   
লে. কর্নেল (অব.) আসাদ
ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল' (IPS) সংক্রান্ত সর্বশেষ নীতি-নির্ধারণী দলি...

সম্প্রতি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল' (IPS) সংক্রান্ত সর্বশেষ নীতি-নির্ধারণী দলিলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই নথিতে স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মুক্ত ও উন্মুক্ত বাণিজ্য, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, বাংলাদেশ সহ এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ পরিকল্পনায় নতুন করে মনোযোগ দিচ্ছে, যা শুধু ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণই নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই কৌশলগত পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দ্বৈত চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করেছে। একদিকে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে, যা দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, এই কৌশলগত জোটবদ্ধতা প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং সামরিক প্রশিক্ষণে নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে। বাংলাদেশ তার 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়' নীতি বজায় রেখে কীভাবে এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে, সার্ক এবং BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংলাপ জোরদার করা এবং সম্মিলিতভাবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগগুলো আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত, যা ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে, এখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে তার সক্ষমতা ও ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করছে। দেশের সমুদ্রসীমা সুরক্ষা, ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকীকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সাবমেরিন সংযোজন এবং অত্যাধুনিক ফ্রিগেট সংগ্রহ এই অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা চাহিদার প্রতিফলন। একইসাথে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে কোনো একক পরাশক্তির প্রভাব এড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা যায়।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৪.০ ৪.১ ৪.৫
UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের সেনা সদস্য সংখ্যা ৬,৭৩১ ৬,৮০৫ ৭,০০২
BIMSTEC সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি (%) ৩.২% ৩.৫% ৪.০%
সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর সামুদ্রিক নিরাপত্তা মহড়ার সংখ্যা

উৎস: SIPRI Military Expenditure Database, UN Peacekeeping Statistics, বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই 'ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল' সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ইন্দো-প্যাসিফিক রোডম্যাপ' প্রণয়ন করতে হবে, যা জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি ২০০৭ এর আলোকে আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC ও সার্ক-এর সাথে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার আইনি কাঠামো শক্তিশালী করবে।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেশের সমুদ্রসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল সুরক্ষায় 'সশস্ত্র বাহিনী গোল ২০৩০' এর আওতায় নৌ ও বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি পাঁচ-বছরের 'আধুনিকীকরণ তহবিল' গঠন করতে হবে, যা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্রয় আইন, ২০২২' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
  • জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবদানকে কাজে লাগিয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক ফোরামে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়' নীতিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে এবং 'শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আইন, ২০১৬' এর অধীনে প্রশিক্ষিত বাহিনীর সক্ষমতাকে আঞ্চলিক সংকট সমাধানে ব্যবহার করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: লে. কর্নেল (অব.) আসাদ

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator