জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত পরিবেশ ও বিপন্ন জনজীবন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত পরিবেশ ও বিপন্ন জনজীবন

ওয়াসিফ ইকবাল  avatar   
ওয়াসিফ ইকবাল
জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত পরিবেশ ও বিপন্ন জনজীবন
জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত পরিবেশ ও বিপন্ন জনজীবন
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, বজ্রপাত ও নদী ভাঙন...

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, বজ্রপাত ও নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগ এ দেশের জনজীবন ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু তহবিল গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) অন্যতম। ২০১০ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন পাসের মাধ্যমে গঠিত এই তহবিল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে, যার উদ্দেশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়ন করা। তবে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ তহবিলের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হচ্ছে, যা দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একাধিক প্রতিবেদন জলবায়ু তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ ও অপচয়ের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। টিআইবি-এর নভেম্বর ২০২৫ সালের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটিএফ-এর অধীনে অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা দুর্নীতি বা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও অপচয় হয়েছে। এটি মোট বরাদ্দের ৫৪ শতাংশেরও বেশি। এই দুর্নীতির মূল ক্ষেত্রগুলো হলো প্রকল্প অনুমোদনে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন (১৭৫ কোটি টাকা), ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম (৬০০ কোটি টাকা) এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অর্থ আত্মসাৎ (১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা)। এমনকি তদারকি পর্যায়েও ৫৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৯-২০২৩ সালে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্ধেকের বেশি ছিল সৌর সড়কবাতি স্থাপন সংক্রান্ত, যেখানে অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে ১৭০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ হয়েছে বলে টিআইবি অনুমান করেছে। এর আগে, ২০২১ সালের মে মাসে টিআইবি অভিযোগ করেছিল যে, ৬৮ কোটি টাকার সাতটি প্রকল্প রাজনৈতিক সুপারিশে অনুমোদন পেয়েছিল এবং এর মধ্যে ৩৭ কোটি টাকা খরচের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এই ধারাবাহিক অভিযোগগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বিসিসিটিএফ রাজনৈতিক যোগসাজশে দুর্নীতির একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে বোর্ডের সদস্য, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল এবং বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের একটি অংশ জড়িত।

শুধু জলবায়ু তহবিল নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরও দুর্নীতির জালে আবদ্ধ। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মার্চ ২০২৩ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্নীতির পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে গরমিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি। কর্ণফুলী সেচ প্রকল্পের (ইছামতি ইউনিট) জন্য প্রায় ২১ কোটি টাকার প্রাক্কলন তৈরি এবং 'প্রোগ্রাম্যাটিক সিডিএম' শীর্ষক প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। টিআইবি-এর আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা, প্রয়োগের ব্যর্থতা এবং সুশাসনের সব সূচকে ঘাটতি এর মূল কারণ। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ শিল্পকারখানা কোনো পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়াই পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে এবং ৬৬ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে (যেমন অনাপত্তিপত্র, অবস্থানগত ছাড়পত্র) যোগসাজশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন করে থাকে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের যোগসাজশ এবং তাদের প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করার কারণে অধিদপ্তরের কার্যকারিতা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া, জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলে (জিসিএফ) বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের অভিগম্যতা জটিল প্রক্রিয়া এবং জিসিএফ কর্তৃক ইউএনডিপিকে বিতর্কিতভাবে পুনরায় স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়েও টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যেখানে ইউএনডিপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অমীমাংসিত ছিল।

এই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং নদী ভাঙন দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে, তখন এই তহবিলগুলোর অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার ২৮ শতাংশই পরিবেশদূষণজনিত নানা অসুখ-বিসুখে মারা গেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মানচিত্রে ধারাবাহিকভাবে অবনতি হয়েছে, যেখানে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭৯তম স্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের আইন না মানা, এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা পরিবেশ সুরক্ষায় প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এমনকি কিছু পরিবেশ সুরক্ষা প্রকল্প উল্টো পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন ২০১০ এবং ২০২৪ সালের সংশোধিত নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবায়ন ও তদারকির ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতি বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞরা বারবার জলবায়ু অর্থায়নে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও জলবায়ু অর্থায়ন সংস্কারে স্থানীয় জনগণের চাহিদা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো বৃহৎ প্রকল্পেও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প সংক্রান্ত সব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তর যদিও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পগুলোর অডিট পরিচালনা করে, তবে টিআইবি-এর প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বিদ্যমান অডিট প্রক্রিয়াগুলোও দুর্নীতির লাগাম টানতে যথেষ্ট কার্যকর নয়।

সুপারিশ: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে সুশাসন নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারভাবে পুনর্গঠন করতে হবে এবং এর ট্রাস্টি বোর্ড ও কারিগরি কমিটির সদস্যদের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কঠোর তদারকি ও তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন অডিট নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্থ আত্মসাৎ ও অপচয়ের সুযোগ বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষ করে পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ু অর্থায়নে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চমত, দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়। পরিশেষে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল যেমন সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ)-এর অর্থায়নে অভিগম্যতা সহজ করতে এবং এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে ।


🔎 অনুসন্ধানে: ওয়াসিফ ইকবাল

ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প অডিট

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator