গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: সম্ভাবনার সেতু নাকি নতুন বিভেদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: সম্ভাবনার সেতু নাকি নতুন বিভেদ?

রেহানা পারভীন  avatar   
রেহানা পারভীন
গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: সম্ভাবনার সেতু নাকি নতুন বিভেদ?
গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: সম্ভাবনার সেতু নাকি নতুন বিভেদ?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে গ্রামীণ নারীদের অংশগ্র...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনই প্রশ্ন তুলছে যে, এই বর্ধিত অংশগ্রহণ কি সত্যিই গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনার সেতুবন্ধন তৈরি করছে, নাকি একইসাথে নতুন ডিজিটাল বিভেদ সৃষ্টি করছে? বিশেষ করে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, তখন এই দ্বিমুখী চিত্র আমাদের গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিঃসন্দেহে গ্রামীণ নারীর শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং কর্মসংস্থান বা আত্ম-কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা এখন ঘরে বসেই অনলাইন কোর্স, ওয়েবিনার এবং বিভিন্ন ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, SEIP-এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে তাদের ডেটা এন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণগুলো তাদের প্রচলিত পেশার বাইরে এসে আধুনিক শ্রমবাজারে প্রবেশে সহায়তা করছে এবং অনেককে ফ্রিল্যান্সিং বা ছোট আকারের ডিজিটাল উদ্যোগ শুরু করতে উৎসাহিত করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষায় ডিজিটাল কনটেন্ট এবং অনলাইন কোর্সের প্রসারেও ভূমিকা রাখছে, যা গ্রামীণ নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগকে আরও সহজলভ্য করে তুলছে, যদিও এর বাস্তবায়ন এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল প্রশিক্ষণের সুযোগই নয়, বরং প্রশিক্ষিত নারীদের জন্য কাজের সুযোগও তৈরি করছে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে সরাসরি অবদান রাখছে।

তবে, এই সম্ভাবনার পাশাপাশি 'নতুন বিভেদ' সৃষ্টির ঝুঁকিও স্পষ্ট। গ্রামীণ নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও ডিজিটাল ডিভাইসের অভাব, ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা, উচ্চ ইন্টারনেট খরচ এবং মৌলিক ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল অবকাঠামোগত ঘাটতি এখনও প্রকট, যা নারী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। উপরন্তু, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা, যেমন পরিবারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে বিধিনিষেধ বা ইন্টারনেটকে 'নিরাপদ' মনে না করার প্রবণতাও এই বিভেদকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে, কিন্তু নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত ও নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে, যারা এই সুযোগগুলো গ্রহণ করতে পারছে, তারা এগিয়ে যাচ্ছে, আর যারা পারছে না, তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে, যা সমাজে একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে — ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সংযোগের ওপর ভিত্তি করে।

এই প্রেক্ষাপটে, গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল অপরিহার্য। NSDA কর্তৃক নির্ধারিত জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালার আওতায় ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং বিশেষায়িত দক্ষতা প্রশিক্ষণের মানদণ্ডকে গ্রামীণ নারীদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। একইসাথে, UGC-এর উচিত উচ্চশিক্ষায় গ্রামীণ নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল রিসোর্স এবং অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার সহজতর করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা। কেবল প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়, প্রশিক্ষণের পর তাদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি, যেখানে তারা অর্জিত দক্ষতা ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হতে পারে। SEIP-এর মতো প্রকল্পগুলোকে আরও বেশি গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া নারীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে হবে, যাতে ডিজিটাল বিভেদ কমে আসে এবং সম্ভাবনার সেতুটি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত হয়।

প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প বছর ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণ (আনুমানিক) মোট প্রশিক্ষিত নারী (আনুমানিক)
SEIP (কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর অংশ) ২০১৮-২০১৯ ১৫,০০০ ৫০,০০০
SEIP (কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর অংশ) ২০২০-২০২১ ২৫,০০০ ৭০,০০০
NSDA (বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক) ২০২২-২০২৩ ৩০,০০০ ৮৫,০০০

উৎস: NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (SEIP-এর অংশ) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আনুমানিক তথ্য।

সুপারিশ

  • গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ইন্টারনেট সংযোগের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১' এর আওতায় 'ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড' ব্যবহার করে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিতে হবে এবং নারী-বান্ধব ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • NSDA কর্তৃক নির্ধারিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১৭' এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে গ্রামীণ নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী, ব্যবহারিক এবং কর্মমুখী ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় থাকবে।
  • UGC-কে উচ্চশিক্ষায় গ্রামীণ নারী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার সহজ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'ডিজিটাল লার্নিং হাব' প্রতিষ্ঠা এবং অনলাইন শিক্ষা উপকরণগুলোতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা পারভীন

রেহানা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator