গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের ফাটল ও উদ্ভাবনের বাধা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের ফাটল ও উদ্ভাবনের বাধা

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের ফাটল ও উদ্ভাবনের বাধা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের ফাটল ও উদ্ভাবনের বাধা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ (প্রাথমিক তথ্য) অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবে...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ (প্রাথমিক তথ্য) অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণাবাবদ বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ২৮% শিল্প খাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যয়িত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের ক্রমবর্ধমান ফাটল এবং ফলস্বরূপ উদ্ভাবনে যে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে, তার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। যেখানে উন্নত বিশ্বে উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের শক্তিশালী অংশীদারিত্ব, সেখানে বাংলাদেশে এই সংযোগের দুর্বলতা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন প্রতিটি দেশের R&D খাতে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য, তখন এই দুর্বল সংযোগ দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে।

এই ফাটলের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পগুলোর শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতা। অনেক ক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমন বিষয়ে গবেষণা করেন যা সরাসরি শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া, পণ্য উন্নয়ন বা বাজার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গবেষণার ফলাফলকে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয় না, যার কারণে গবেষণায় বিনিয়োগে তাদের অনীহা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৭০% মনে করে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দক্ষতা তাদের প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়, যা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প খাতের গভীর অসামঞ্জস্যতা নির্দেশ করে। একইসাথে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব সীমাবদ্ধতাও এই সমস্যার জন্য দায়ী। প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাব সুবিধা, উচ্চমানের গবেষণা উপকরণ এবং শিল্পে অভিজ্ঞ গবেষকের অভাব প্রায়শই শিল্প-সংশ্লিষ্ট যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। উচ্চশিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ইউজিসি (UGC) কর্তৃক বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশ মৌলিক গবেষণায় ব্যয় হলেও, প্রায়োগিক গবেষণায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পৃক্ততা বা তাদের পরামর্শভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এই বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত দেশের R&D ইকোসিস্টেমকে দুর্বল করে দেয় এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা হ্রাস করে।

অন্যদিকে, শিল্প খাতের পক্ষ থেকেও বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও আগ্রহের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদী মুনাফা অর্জনে বেশি আগ্রহী হওয়ায় R&D-তে উচ্চ বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চায় না, যা দীর্ঘমেয়াদী উদ্ভাবনের জন্য অপরিহার্য। এর সাথে যোগ হয়েছে তথ্য আদান-প্রদানের অভাব এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তাদের প্রযুক্তিগত গোপনীয়তা বা ব্যবসায়িক কৌশল প্রকাশ করতে দ্বিধা করে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শিল্পের চাহিদা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) ও স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে শিল্প প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময়ের সুযোগ থাকলেও, তা গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র উদ্ভাবনের গতিকেই শ্লথ করছে না, বরং উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধিতেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা শিল্পের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ হয়ে উঠছে না। ফলস্বরূপ, দেশের R&D খাতে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে, এবং বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথে বড় বাধা।

বাংলাদেশের R&D খাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প সংযোগের প্রবণতা (২০২০-২০২৪)
অর্থবছর মোট বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা বরাদ্দ (কোটি টাকা) শিল্প খাতের সাথে যৌথ গবেষণা বরাদ্দ (কোটি টাকা) শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় যৌথ গবেষণার অনুপাত (%)
২০২০-২১ ৮৫০ ২৪০ ২৮.২৩
২০২১-২২ ৯১০ ২৬৫ ২৯.১০
২০২২-২৩ ৯৫০ ২৭৫ ২৮.৯৪
২০২৩-২৪ (প্রা.) ১০০০ ২৮০ ২৮.০০

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৪ (প্রাথমিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর সমন্বয়ে একটি 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন নীতিমালা' প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব গবেষণায় বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা (যেমন – কর মওকুফ বা ভর্তুকি) প্রদানের বিধান রাখবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মাধ্যমে 'শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ল্যাব' স্থাপনের জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা যেতে পারে, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্দিষ্ট R&D চাহিদা নিয়ে আসবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও অবকাঠামো ব্যবহার করে সমাধান প্রদান করবে, যার ফলে বাস্তবভিত্তিক উদ্ভাবন সহজ হবে।
  • BANBEIS-কে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মান উন্নত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে, এবং প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সম্পাদিত গবেষণা চুক্তি, পেটেন্ট আবেদন এবং বাণিজ্যিকীকৃত উদ্ভাবনের উপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator