গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিল্প-সম্পর্কিত গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা বেসরকার...

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিল্প-সম্পর্কিত গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণে বিদ্যমান ফারাককে আবারও সামনে এনেছে। যদিও জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে (আরএন্ডডি) বেসরকারি বিনিয়োগের গুরুত্ব সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত, বাংলাদেশে এই খাতে কর্পোরেট অংশগ্রহণের চিত্র হতাশাজনক। দেশের জিডিপির ০.৩ শতাংশেরও কম গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় হয়, যার সিংহভাগই আসে সরকারি তহবিল থেকে। এই স্বল্প বিনিয়োগ দেশের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যা একটি টেকসই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়।

এই ফারাকের মূল কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে অনীহার পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়। প্রথমত, উদ্ভাবনী গবেষণার দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা এবং তাৎক্ষণিক মুনাফার মধ্যে সংঘাত। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক মুনাফামুখী হওয়ায় গবেষণা ও উন্নয়নের উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং অনিশ্চিত ফলাফলের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা বোধ করে। এছাড়া, বাংলাদেশে শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের অভাব প্রকট। ইউজিসি বারবার এই সংযোগ বৃদ্ধির কথা বললেও, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম এবং শিল্পের চাহিদা ও বাস্তবতার মধ্যে প্রায়শই সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা খাতে গবেষণায় মোট ব্যয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশই আসে বেসরকারি উৎস থেকে, যা দেশের সামগ্রিক উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেমকে দুর্বল করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমগুলোও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার অভাবে বিশ্বমানের হয়ে উঠতে পারছে না, কারণ গবেষণালব্ধ জ্ঞানই যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ভিত্তি তৈরি করে।

গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগের এই ঘাটতি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদ্ভাবনের অভাবে দেশের শিল্প খাতগুলো নতুন প্রযুক্তি ও পণ্যের জন্য বৈদেশিক নির্ভরতা কমাচ্ছে না, বরং তা বাড়িয়েই চলেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুনত্ব আসছে না এবং বিদ্যমান কর্মীরাও আধুনিক বৈশ্বিক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি) এর মতো উদ্যোগগুলো দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, গবেষণার অভাবে এই দক্ষতাগুলো প্রায়শই মৌলিক ও গতানুগতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে, যা উচ্চমানের উদ্ভাবনী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি প্রযুক্তিগত গবেষণায় পর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগ না থাকে, তবে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বা নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়। এই পরিস্থিতি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে রাখছে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধাভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সূচক বাংলাদেশ (২০২১-২২) দক্ষিণ এশিয়ার গড় (২০২১) উন্নত দেশের গড় (২০২১)
জিডিপির শতাংশ হিসেবে গবেষণা ও উন্নয়ন (GERD) ০.১৯% ০.৫২% ২.৫০%
GERD-এ বেসরকারি খাতের অবদান ১০-১৫% ২৫-৩০% ৬৫-৭৫%
শিল্প-একাডেমিয়া গবেষণা সহযোগিতা (বার্ষিক, আনুমানিক) ৩০-৪০টি প্রকল্প ১০০+ প্রকল্প ১০০০+ প্রকল্প

উৎস: জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি প্রতিবেদন, ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস (UIS)

সুপারিশ

  • সরকারকে 'গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগ প্রণোদনা আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগের জন্য কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য কর ছাড়, গবেষণা অনুদান এবং ম্যাচিং ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এই আইন ইউজিসি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি যৌথ গবেষণা তহবিল গঠনের মাধ্যমে কার্যকর করা যেতে পারে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (R&D Centre) স্থাপনের জন্য একটি বাধ্যতামূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। এই নীতিতে নির্দিষ্ট শিল্প খাতগুলোকে তাদের মোট আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হবে এবং এসইআইপি-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলকে এসব কেন্দ্রে নিয়োগের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
  • মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিকীকরণের জন্য বিদ্যমান 'পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক আইন' শক্তিশালীকরণ এবং এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ইউজিসিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ল্যাবগুলোকে আধুনিকীকরণের জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দিতে হবে এবং এই ল্যাবগুলোতে উৎপাদিত উদ্ভাবনের পেটেন্ট প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য একটি দ্রুত ট্র্যাক সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে উৎপাদিত গবেষণার বাণিজ্যিক সুবিধা দ্রুত পেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator