লোহিত সাগরের অস্থিরতা: বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ঝুঁকি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

লোহিত সাগরের অস্থিরতা: বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ঝুঁকি

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
লোহিত সাগরের অস্থিরতা: বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ঝুঁকি
লোহিত সাগরের অস্থিরতা: বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কন্টেইনার শিপিং কোম্...

গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি মার্স্ক (Maersk) তাদের সকল জাহাজকে লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ রুট দিয়ে ঘুরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত কেবল পণ্যবাহী জাহাজের জন্য নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকারগুলির জন্যও এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। সুয়েজ খাল ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ১২% বাণিজ্যিক পণ্য এবং ৮% এলএনজি সরবরাহ পরিচালিত হয়, যার মধ্যে কাতারের ইউরোপগামী এলএনজি চালানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই রুট ব্যবহার করে। লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে, যা সরাসরি এলএনজি সরবরাহ খরচ বৃদ্ধি, ট্রানজিট সময় দীর্ঘায়িত করা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা বাজারে জ্বালানির মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে।

লোহিত সাগরের এই অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহকারীদের জন্য তাৎক্ষণিক অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কাতার, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ, ইউরোপে তাদের গ্যাস সরবরাহের জন্য সুয়েজ খালের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ট্যাংকারগুলির কেপ অফ গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় প্রতিটি চালানে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগছে, যা জ্বালানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই দীর্ঘায়িত যাত্রা কেবল জ্বালানি ব্যয়ই বাড়ায় না, বরং জাহাজ ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়ামকেও আকাশচুম্বী করেছে। লয়েড'স অফ লন্ডনের মতো বৈশ্বিক বীমা সংস্থাগুলি লোহিত সাগরকে 'যুদ্ধাঞ্চল' হিসাবে চিহ্নিত করায় বীমা খরচ প্রায় ২০০-৩০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলস্বরূপ, এলএনজি সরবরাহকারীরা তাদের নির্ধারিত চুক্তির অধীনেও উচ্চতর পরিবহন খরচ বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির বৈশ্বিক মূল্যে প্রভাব ফেলবে। ইউরোপ, যা পূর্বে রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং এখন এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে, তারা এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দ্বারা গঠিত 'অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান' (Operation Prosperity Guardian) সামরিক জোট লোহিত সাগরে শিপিং লেন সুরক্ষিত করার চেষ্টা করলেও হুথি আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। এটি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ক্ষমতা ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের বিস্তার একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলি এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ তাদের জ্বালানি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সরাসরি লোহিত সাগরের নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল। এই অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে স্পট মার্কেটগুলিতে এলএনজি-এর দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। এশিয়ার দেশগুলি, যারা এলএনজি-এর অন্যতম প্রধান আমদানিকারক, তারাও এই দীর্ঘ ট্রানজিট সময় এবং উচ্চ মূল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এর ফলে দেশগুলি নতুন সরবরাহ রুট বা বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি ভূ-চিত্রকে পরিবর্তন করতে পারে।

সূচক সাধারণ পরিস্থিতি (২০২৩) লোহিত সাগরের অস্থিরতার প্রভাব (জানুয়ারি ২০২৪) পরিবর্তন
সুয়েজ খাল দিয়ে এলএনজি ট্যাংকার চলাচল (মাসিক গড়) প্রায় ৭০-৮০টি প্রায় ৩০-৪০টি ৫০% এর বেশি হ্রাস
কেপ অফ গুড হোপ রুটে অতিরিক্ত ট্রানজিট সময় ০ দিন ১০-১৫ দিন উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
এশিয়ায় এলএনজি স্পট মূল্য বৃদ্ধি (প্রতি MMBtu) ৯-১২ USD ১৩-১৭ USD ৩০-৪৫% বৃদ্ধি
লোহিত সাগরগামী শিপিং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম ০.০৫-০.১% (জাহাজের মূল্যের) ০.৫-১.০% (জাহাজের মূল্যের) ৫০০-১০০০% বৃদ্ধি
প্রতিটি এলএনজি চালানে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ (মিলিয়ন USD) ১-২ মিলিয়ন USD উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি

উৎস: রয়টার্স, বুমবার্গ এলএনজি ভেসেল ট্র্যাকার ডেটা এবং শিপিং ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার রিপোর্ট, জানুয়ারি ২০২৪

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিশেষত, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলিকে সমর্থন এবং প্রয়োজনে আঞ্চলিক দেশগুলির সাথে সমন্বয় করে একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ বা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাবনা তুলে ধরতে হবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলির অধীনে সদস্য দেশগুলির মধ্যে একটি সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এর মধ্যে জরুরি পরিস্থিতিতে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি, যৌথ কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সদস্য দেশগুলির মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো সংযোগ (যেমন, গ্যাস পাইপলাইন) উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
  • জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলএনজি উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এবং বিকল্প অবকাঠামো (যেমন, ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট - FSRU) স্থাপনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ বিনিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator