সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করতে ঘোষিত ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) খাতের জন্য লেনদেন সীমা শিথিলকরণ, দেশের অর্থ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ঋণের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট এবং আধুনিক অর্থায়ন পদ্ধতিগুলো এখন SME খাতের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে না, বরং SME-দের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের পথও সুগম করছে, যা একসময় তাদের নাগালের বাইরে ছিল।
ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যাপক প্রচলন SME-দের আর্থিক লেনদেনকে একটি কাঠামোগত রূপ দিচ্ছে, যা তাদের ক্রেডিট স্কোরিং এবং ঋণ মূল্যায়নের জন্য অপরিহার্য উপাত্ত সরবরাহ করছে। পূর্বে, বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের কারণে তাদের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারতেন না, ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতে সমস্যা হতো। এখন, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সম্পাদিত প্রতিটি লেনদেন একটি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তৈরি করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারকারী SME-দের জন্য আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে স্বচ্ছ লেনদেন ব্যবস্থা তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কতটা সহায়ক। এটি কেবল পুঁজি প্রবাহ বৃদ্ধি করছে না, বরং উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি সুসংগঠিত আর্থিক শৃঙ্খলাও তৈরি করছে, যা তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং সম্প্রসারণের জন্য অত্যাবশ্যক।
ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতির প্রসারের ফলে SME-দের জন্য সাপ্লাই চেইন অর্থায়ন (Supply Chain Finance) এবং ফ্যাক্টরিং (Factoring) এর মতো অভিনব অর্থায়ন মডেলগুলোও সহজলভ্য হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে এই ধরনের অর্থায়ন মডেলগুলোকে উৎসাহিত করছে, যেখানে বিক্রেতা, ক্রেতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী তার চালান (invoice) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জমা দিয়ে দ্রুত অর্থ পেয়ে যেতে পারেন, যা তার ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাব মেটাতে সহায়তা করে। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব SME ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করে রপ্তানি কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে, তাদের লেনদেনের গতি এবং নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণকে আরও সহজ করেছে। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) SME প্ল্যাটফর্মে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমেও বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে, যা ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ডেটার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ |
|---|---|---|---|---|
| ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারকারী SME-দের সংখ্যা (লক্ষ) | ১০.৫ | ১৪.২ | ১৮.৯ | ২৫.৩ |
| SME খাতে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ (বিলিয়ন টাকা) | ১৩০ | ১৭৫ | ২৪০ | ৩২০ |
| ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে SME ঋণ বিতরণ (বিলিয়ন টাকা) | ৯৫০ | ১১২০ | ১৩৫০ | ১৫৮০ |
| রপ্তানি কার্যক্রমে যুক্ত ডিজিটাল SME-দের হার (%) | ৭.৮ | ৯.৫ | ১২.১ | ১৫.৫ |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, NBR, EPB, CPD (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)
সুপারিশ
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে SME-দের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের ওপর ট্যাক্স ইনসেনটিভের পরিধি বাড়াতে হবে এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে সেবাদাতাদের জন্য লেনদেন ফি কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাথে সমন্বয় করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যৌথভাবে একটি সহজীকৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যার মাধ্যমে SME-রা তাদের ডিজিটাল লেনদেনের ডেটা ব্যবহার করে শেয়ারবাজারের SME বোর্ডে তালিকাভুক্ত হতে পারবে এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড থেকে অর্থায়ন পেতে পারবে।
- এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) কে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে স্থানীয় SME-দের সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করতে হবে এবং রপ্তানিমুখী SME-দের জন্য ডিজিটাল কমার্স ট্রেনিং ও ফিনান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম আয়োজন করতে হবে, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-এর নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।