কিশোরী মাতৃত্বের ফাঁদ: বাল্যবিবাহের অদৃশ্য প্রভাব ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

ডা. ফারজানা খাতুন  avatar   
ডা. ফারজানা খাতুন
কিশোরী মাতৃত্বের ফাঁদ: বাল্যবিবাহের অদৃশ্য প্রভাব ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
কিশোরী মাতৃত্বের ফাঁদ: বাল্যবিবাহের অদৃশ্য প্রভাব ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী মায়েদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি ...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী মায়েদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক মাতৃমৃত্যু হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, অপরিণত গর্ভধারণ এবং প্রসবকালীন জটিলতা এই বয়সের মায়েদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বাল্যবিবাহের অদৃশ্য প্রভাব এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর এর সুদূরপ্রসারী ঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে।

বাল্যবিবাহ কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বিবাহিত মেয়েদের হার এখনো দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চগুলির মধ্যে একটি, যা কিশোরী মাতৃত্বের পথ প্রশস্ত করে। এই অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে মায়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তাদের শরীর গর্ভাবস্থা ও প্রসবের জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকে না, যার ফলে রক্তক্ষরণ, প্রসবকালীন ফিস্টুলা, উচ্চ রক্তচাপ (প্রি-এক্লাম্পসিয়া) এবং সেপসিসের মতো জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর গবেষণা বলছে, কিশোরী মায়েদের মধ্যে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা (পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন) এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রবণতা বয়স্ক মায়েদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা তাদের এবং নবজাতকের সুস্থ জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া, অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের কারণে অপুষ্টির শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে, যা মা ও শিশুর উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

কিশোরী মাতৃত্বের কারণে নবজাতকের স্বাস্থ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশুদের ওজন কম হয় এবং তারা নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভোগে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার কারণে নবজাতক মৃত্যুহারও বেড়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বাল্যবিবাহ নিরসনে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করলেও, তৃণমূল পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক রীতিনীতি বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রেখেছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার বেশি, সেসব অঞ্চলে নবজাতক ও শিশু মৃত্যুহারও তুলনামূলকভাবে বেশি। এর কারণ হিসেবে অপরিণত মাতৃত্বের ফলে মায়ের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হলেও, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং বাল্যবিবাহের অবসান।

বছর ১৫-১৯ বছর বয়সী মায়েদের মাতৃমৃত্যুর হার (প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে) বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) নবজাতক মৃত্যুহার (প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে)
২০১৮ ১০০ ৫১.৪% ২১
২০১৯ ১০৫ ৫০.৮% ২০
২০২০ ১১০ ৪৯.২% ১৯
২০২১ ১১৮ ৪৮.২% ১৮
২০২২ ১২৫ ৪৭.৮% ১৭

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS)

সুপারিশ

  • বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ) নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া মাত্র দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)-কে কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি চালু করতে হবে, যেখানে স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প, মোবাইল ক্লিনিক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সঠিক তথ্য ও কাউন্সেলিং প্রদান করা হবে। বিশেষ করে, DGHS-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিশোরী স্বাস্থ্য কর্নার শক্তিশালীকরণ এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর সহায়তায় কিশোরী মা এবং তাদের পরিবারের জন্য প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি (Postpartum Mental Health Support Program) চালু করতে হবে, যেখানে কাউন্সেলিং, গ্রুপ থেরাপি এবং প্রয়োজনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-অনুমোদিত ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচিতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফারজানা খাতুন

ডা. ফারজানা খাতুন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator