ভোটের মাঠে ডিজিটাল নজরদারি: স্বচ্ছতা না আস্থার সংকট?

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
ভোটের মাঠে ডিজিটাল নজরদারি: স্বচ্ছতা না আস্থার সংকট?
ভোটের মাঠে ডিজিটাল নজরদারি: স্বচ্ছতা না আস্থার সংকট?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ সচিবালয় কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় সংসদ নির্বাচন (প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি) বিল ২০২৪'-এর খসড়ায় ভোটকেন্দ্রে ডিজিটাল নজরদারির আধুনিকীকরণ এবং অনলা...

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ সচিবালয় কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় সংসদ নির্বাচন (প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি) বিল ২০২৪'-এর খসড়ায় ভোটকেন্দ্রে ডিজিটাল নজরদারির আধুনিকীকরণ এবং অনলাইন প্রক্রিয়ায় অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান সংযোজন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সুশীল সমাজে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই খসড়া বিলটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোট গণনা ও ফলাফলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা একদিকে যেমন দ্রুত ও নির্ভুল ফল প্রকাশে সহায়ক হতে পারে, তেমনি অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কাও তৈরি করেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতোমধ্যেই বিভিন্ন নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যেখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জনআস্থা উভয়ই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, নতুন ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার প্রস্তাবনা কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আস্থার সংকট নিরসনে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন।

ডিজিটাল নজরদারির ধারণাটি মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এর বাস্তবায়নে প্রায়শই জটিলতা দেখা দেয়। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যেখানে কিছু কেন্দ্রে অনিয়ম ধরা পড়ায় ভোট বাতিল করা হয়েছিল। তবে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। World Bank-এর 'Governance Indicators' রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের 'Voice and Accountability' সূচকে বিগত এক দশকে তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি, যা জনগণের অংশগ্রহণে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাদের আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। নতুন প্রস্তাবিত ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থায় AI-এর ব্যবহার যদি শুধুমাত্র ডেটা সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং এর প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মানবীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে, তাহলে প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। উপরন্তু, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, ডেটা সুরক্ষার অভাব এবং প্রযুক্তির অ্যাক্সেসের অসমতাও এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে অনেক ভোটারই এই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেদের যুক্ত করতে পারবেন না, যা ডিজিটাল বিভাজন বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং অংশগ্রহণের সুযোগকে সীমিত করতে পারে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Digital Bangladesh Strategy' শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিলেও, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এর প্রয়োগে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এবং ডেটা সুরক্ষা আইনের দুর্বলতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করলেও, এর প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং এটি ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে জনমনে সংশয় বিদ্যমান। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ডিজিটাল নজরদারি কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইনি কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা। যদি এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র ক্ষমতাশীলদের সুবিধা প্রদানের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। বরং, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ মনিটরিং কমিটি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে এর নকশা, বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত সকলের সততা ও জবাবদিহিতার ওপর।

বছর মোট নিবন্ধিত ভোটার ইভিএম ব্যবহৃত কেন্দ্রের সংখ্যা (মোট কেন্দ্রের %) ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি (শতাংশ) নির্বাচনী সহিংসতা (প্রতিবেদনকৃত ঘটনা) World Bank Governance Index: Voice & Accountability (0-100)
২০১৮ ১০.৪২ কোটি ৬ (০.০২%) ১.৫% ১,০০০+ ৩০.৫
২০২৩ ১১.৯৬ কোটি ৭,০০৯ (২.৮%) ৪.২% ১,২০০+ ২৯.৮
২০২৪ (প্রস্তাবিত) ১২.০৮ কোটি (আনুমানিক) সর্বাধিক (প্রস্তাবিত) ৩০% (লক্ষ্য) অজ্ঞাত অজ্ঞাত

উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (২০১৮, ২০২৩), World Bank Governance Indicators (২০১৮, ২০২৩), জাতীয় সংসদ সচিবালয় (২০২৪ খসড়া বিল)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত 'জাতীয় সংসদ নির্বাচন (প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি) বিল ২০২৪'-এ ডিজিটাল নজরদারি সংক্রান্ত ধারাগুলোতে ভোটারদের ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR (General Data Protection Regulation)-এর আদলে একটি কঠোর ও স্বাধীন 'ডেটা সুরক্ষা আইন' অন্তর্ভুক্ত করা। এই আইনের অধীনে একটি স্বাধীন 'ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ' গঠন করতে হবে, যারা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ডিজিটাল নজরদারি পদ্ধতির সকল ডেটা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণকে নিয়মিত নিরীক্ষা করবে।
  • নির্বাচন কমিশনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-এর সহযোগিতায় একটি 'জাতীয় ডিজিটাল নির্বাচনী নিরাপত্তা কমিটি' গঠন করতে হবে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কমিটি ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করবে, হ্যাকিং ও ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকরী প্রোটোকল তৈরি করবে এবং নির্বাচনী ডেটার অখণ্ডতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা পরিচালনা করবে।
  • World Bank এবং ADB-এর কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নে নির্বাচন কমিশনকে একটি 'স্বচ্ছ ডিজিটাল নির্বাচন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম' তৈরি করতে হবে, যা ভোটের দিন থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ডিজিটাল নজরদারির প্রতিটি ধাপের ডেটা রিয়েল-টাইমে প্রকাশ করবে। এই প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ দায়ের, নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং সিসিটিভি ফুটেজের নির্বাচিত অংশ (ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রেখে) জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যা স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator