এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

নাসরিন সুলতানা  avatar   
নাসরিন সুলতানা
এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২৩,৮২৫ কোটি টাকা পিছিয়ে পড়েছে, যা ...

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২৩,৮২৫ কোটি টাকা পিছিয়ে পড়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। এই রাজস্ব ঘাটতি কেবল সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই বাধা সৃষ্টি করছে না, বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শুল্ক ও কর নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে, আমদানি শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার বিচ্যুতি ইঙ্গিত দেয় যে, একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পেয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ভোগেও স্থবিরতা এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে, এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতির একটি সুদূরপ্রসারী বিশ্লেষণ অপরিহার্য, যেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও সম্ভাবনার সঠিক পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল কর কাঠামো এবং ঘন ঘন শুল্ক নীতির পরিবর্তনের দ্বারা প্রভাবিত। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের নীতি প্রায়শই শেষ মুহূর্তের বাজেটারি ঘোষণায় পরিবর্তিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে। শিল্প উদ্যোক্তারা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে, এনবিআর-এর বিভিন্ন সার্কুলার এবং প্রজ্ঞাপন সময়মতো প্রকাশিত হয় না, অথবা তার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থাকে, যার ফলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয় এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ) বা অর্থনৈতিক অঞ্চল (EZ) গুলিতে প্রদত্ত কর অবকাশ এবং শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধাগুলো একদিকে যেমন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, তেমনি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গুলোকে একই ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে, যা প্রতিযোগিতার অসম ক্ষেত্র তৈরি করে। এই বৈষম্য দূরীকরণ না হলে, স্থানীয় বিনিয়োগের গতি কমে যাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা আসবে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও, কর নীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব প্রায়শই এর সুফল সীমিত করে দেয়। যেমন, লভ্যাংশের উপর কর, মূলধনী লাভের উপর কর এবং তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করের তারতম্য বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রায়শই শিল্প সুরক্ষার নামে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, যা স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করলেও, ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে বাধা দেয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কেবল করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এনবিআর-এর আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া ধীর গতিতে চলায় কর ফাঁকি রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে, ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্প এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো অনেক পিছিয়ে, যার ফলে ব্যবসায়িক লেনদেনে জটিলতা রয়েই গেছে।

খাত ২০২২-২৩ (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকা) ২০২২-২৩ (জুলাই-ডিসেম্বর) আদায় (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ (জুলাই-ডিসেম্বর) আদায় (কোটি টাকা) লক্ষ্যমাত্রা বিচ্যুতি (কোটি টাকা)
আমদানি শুল্ক ৪৯,৫০০ ৪৫,৮৫০ ৫৭,২০০ ৫২,৪০০ -৪,৮০০
মূসক (ভ্যাট) ৫৬,৭০০ ৫৩,৩০০ ৬৫,৮০০ ৫৯,৬৫০ -৬,১৫০
আয়কর ৫৩,৪০০ ৫১,৫০০ ৬১,৬০০ ৫৯,৬০০ -২,০০০
অন্যান্য কর ৩,২০০ ২,৯০০ ৩,৭০০ ৩,৩০০ -৪০০
মোট রাজস্ব ১,৬২,৮০০ ১,৫৩,৫৫০ ১,৮৮,৩০০ ১,৬৪,৯৭৫ -২৩,৩২৫

উৎস: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত তথ্য

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এনবিআর-কে সমন্বয় করে একটি পাঁচ বছর মেয়াদী স্থিতিশীল শুল্ক ও কর নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের নীতিমালা শিল্প নীতি ২০২৩-এর আলোকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকবে এবং প্রতি অর্থবছরে বাজেটারি ঘোষণার মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন পরিহার করা হবে।
  • এনবিআর-এর ভ্যাট অটোমেশন ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা ২০২৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ কার্যকর করতে হবে এবং সকল করদাতার জন্য একটি একক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যা কর ফাঁকি রোধে কার্যকর হবে এবং ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) ও বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) এর মধ্যে ডেটা ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর সাথে পরামর্শ করে, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য লভ্যাংশ এবং মূলধনী লাভের উপর করের হার যৌক্তিক ও স্থিতিশীল রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট কর কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন সুলতানা

নাসরিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator